জ্বালানি সংকট

পরিসংখ্যান নয়, বাস্তব ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা

এফএনএস
| আপডেট: ২৮ মার্চ, ২০২৬, ০৪:০৪ পিএম | প্রকাশ: ২৮ মার্চ, ২০২৬, ০৪:০৪ পিএম
পরিসংখ্যান নয়, বাস্তব ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা

সরকারের দাবি-গত বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তেল না পাওয়া, কোথাও সীমিত বিক্রি, কোথাও পাম্প বন্ধ-এসব দৃশ্য প্রমাণ করে যে সংকট কেবল সরবরাহের পরিমাণের নয়; এটি ব্যবস্থাপনার গভীর দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। দৈনিক খবরাখবর বলছে, মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণে স্পষ্ট, এই সংকট আমদানির ঘাটতির কারণে নয়। বরং পরিকল্পনাহীনতা, সমন্বয়ের অভাব এবং দীর্ঘদিনের নীতিগত অব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। আন্তর্জাতিক অস্থিরতা-বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা-আগেই অনুমেয় ছিল। কিন্তু সেই অনুযায়ী পর্যাপ্ত মজুত গড়ে তোলা বা বিকল্প পরিকল্পনা নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি ছিল অপ্রতুল। সংকটের শুরুতেই রেশনিং চালু করে পরে তা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোটা ভিত্তিক সরবরাহ, যা বর্তমান চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পাম্প মালিকদের অভিযোগ, তারা চাহিদার তুলনায় ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কম তেল পাচ্ছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই অল্প সময়েই তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। ব্যাংকিং জটিলতা এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। পে-অর্ডার ছাড়া ডিপো থেকে তেল উত্তোলনের সুযোগ না থাকায় ঈদের ছুটিতে সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিকল্প অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা না থাকা পরিকল্পনার ঘাটতিকেই নির্দেশ করে। জরুরি সময়ে ডিপো খোলা রাখা কিংবা সরবরাহ চেইন সচল রাখার মতো মৌলিক প্রস্তুতির অভাব প্রশ্ন তোলে সংশ্লিষ্টদের সক্ষমতা নিয়ে। এদিকে চাহিদা ক্রমাগত বাড়লেও মজুত সক্ষমতা সেই হারে বাড়েনি। গত কয়েক বছরে তেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও দেশের মজুত ক্ষমতা এখনও ৩০-৩৫ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যেখানে আঞ্চলিক ও উন্নত দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি মজুত সক্ষমতা গড়ে তুলেছে, সেখানে বাংলাদেশের এই সীমাবদ্ধতা যে কোনো সংকটকে দ্রুত প্রকট করে তোলে। এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ ও কৃষক। পরিবহন খাতে অচলাবস্থা তৈরি হচ্ছে, পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে, ভাড়া বৃদ্ধির আশঙ্কা বাড়ছে। কৃষিক্ষেত্রে ডিজেলের অভাবে সেচ ও কীটনাশক প্রয়োগ ব্যাহত হচ্ছে, যা সরাসরি খাদ্য উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। একইসঙ্গে কালোবাজারি ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এ অবস্থায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ সমন্বয় এবং মজুত সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এছাড়াও ব্যাংকিং নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সর্বোপরি, সংকট মোকাবিলায় আগাম পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পরিসংখ্যান দিয়ে বাস্তবতাকে আড়াল করা সম্ভব নয়। জ্বালানি খাতে টেকসই ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি-নইলে এমন সংকট বারবার ফিরে আসবে, আর তার মূল্য দেবে সাধারণ মানুষই।