ডিজিটাল ফাঁদে যুবসমাজ

অনলাইন জুয়া ও অনৈতিক কনটেন্টে বাড়ছে ঝুঁকি

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৩১ মার্চ, ২০২৬, ০৮:১৪ এএম
অনলাইন জুয়া ও অনৈতিক কনটেন্টে বাড়ছে ঝুঁকি

বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি এর অপব্যবহার নতুন ধরনের সামাজিক সংকটও তৈরি করছে। বিশেষ করে অনলাইন জুয়া, পর্নোগ্রাফি এবং অনৈতিক বিজ্ঞাপনের বিস্তার এখন এক গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা, ইন্টারনেটের সুলভ ব্যবহার এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের সুযোগ নিয়ে এই অনিয়ন্ত্রিত কনটেন্টগুলো তরুণ সমাজকে দ্রুত আকৃষ্ট করছে। ফলে একদিকে যেমন ব্যক্তি পর্যায়ে আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির ঘটনা বাড়ছে, অন্যদিকে সমাজের নৈতিক ভিত্তিও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

একসময় জুয়া ছিল সীমিত পরিসরের একটি কার্যক্রম, যা নির্দিষ্ট কিছু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু ডিজিটাল যুগে এসে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন মোবাইল ফোনের কয়েকটি ক্লিকেই অনলাইন ক্যাসিনো, স্পোর্টস বেটিং কিংবা বিভিন্ন গেমিং অ্যাপের মাধ্যমে জুয়ার জগতে প্রবেশ করা যায়। অনেক সময় সাধারণ গেমের আড়ালেও থাকে জুয়ার উপাদান, যা ব্যবহারকারীদের অজান্তেই এই অভ্যাসে জড়িয়ে ফেলে। ক্রিকেট, ফুটবল, টেনিসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্টকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে বিশাল বেটিং নেটওয়ার্ক, যেখানে প্রতিটি বল, প্রতিটি মুহূর্তকে কেন্দ্র করে বাজি ধরার সুযোগ থাকে।

এই প্ল্যাটফর্মগুলো সাধারণত নতুন ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করতে ‘ফ্রি বোনাস’, ‘ট্রায়াল ব্যালেন্স’ বা ‘ইনস্ট্যান্ট রিওয়ার্ড’-এর মতো প্রলোভন দেখায়। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণরা শুরুতে বিনা খরচে এসব অ্যাপে যুক্ত হয় এবং পরে ধীরে ধীরে বাস্তব অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে এটি নেশায় পরিণত হয় এবং অনেকেই আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার না জানতেই একজন তরুণ বড় অঙ্কের অর্থ হারিয়ে ফেলছে, যা পরবর্তীতে সামাজিক ও মানসিক সংকট তৈরি করছে।

এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও সহজ করে তুলেছে মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা। দেশীয় কিছু এজেন্ট বা মধ্যস্থতাকারী এই লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত থাকে, যারা নির্দিষ্ট কমিশনের বিনিময়ে অর্থ স্থানান্তরে সহায়তা করে। এতে করে পুরো জুয়া কার্যক্রমটি একটি সংগঠিত অর্থনৈতিক চক্রে পরিণত হয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

সরকার ইতোমধ্যে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে অনলাইন জুয়া ও অনৈতিক কনটেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, দেশের সাইবার স্পেসকে নিরাপদ, নৈতিক ও প্রজন্মবান্ধব রাখতে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে। বিদ্যমান আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে- অনলাইনে জুয়া, বেটিং বা পর্নোগ্রাফি সংক্রান্ত কনটেন্ট তৈরি, প্রচার বা বিজ্ঞাপন দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ।

এই প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যম, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, টেলিভিশন চ্যানেল এবং ডিজিটাল বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে যাতে তারা কোনোভাবেই এ ধরনের কনটেন্ট প্রচার না করে। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট নির্মাতা, সেলিব্রিটি ও ইনফ্লুয়েন্সারদেরও অনুরোধ জানানো হয়েছে- তারা যেন অনৈতিক পণ্য বা প্ল্যাটফর্মের প্রচারে অংশ না নেন। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি কোম্পানি ও বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্মগুলোকেও স্থানীয় আইন মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

তবে বাস্তবতা বলছে, এই সমস্যার সমাধান এতটা সহজ নয়। প্রযুক্তিগত কৌশল ব্যবহার করে একের পর এক নতুন ওয়েবসাইট বা অ্যাপ চালু করা হচ্ছে। একটি প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করা হলে সঙ্গে সঙ্গে নতুন ডোমেইনে সেটি আবার চালু হয়ে যাচ্ছে। বিদেশি সার্ভারে পরিচালিত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে এসব প্ল্যাটফর্মের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এছাড়া এই খাতে বিপুল মুনাফার সম্ভাবনা থাকায় অনেকেই গোপনে এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনীহাও এই সমস্যা সমাধানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোবাইল অপারেটরদের ক্ষেত্রেও অভিযোগ রয়েছে- তারা ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ার কারণে এই ধরনের কার্যক্রম বন্ধে তেমন আগ্রহ দেখায় না। অন্যদিকে, ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করতে নানা ধরনের প্রলোভনমূলক বার্তা ও অফার পাঠানো হচ্ছে, যা তরুণদের আরও বেশি ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজন সমন্বিত ও বহুমাত্রিক উদ্যোগ। শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা জোরদার করা এবং তরুণদের বিকল্প ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা জরুরি। প্রযুক্তির সহায়তায় ক্ষতিকর সাইট শনাক্ত ও ব্লক করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়াও প্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- তরুণদের এই ডিজিটাল ফাঁদ থেকে ফিরিয়ে আনতে সমাজের সব স্তরের মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সাধারণ নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একটি নিরাপদ, সচেতন ও নৈতিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। অন্যথায়, এই অদৃশ্য সংকট ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।