বিকল্প জ্বালানির খোঁজে বাংলাদেশ, জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১ এপ্রিল, ২০২৬, ০৮:১২ এএম
বিকল্প জ্বালানির খোঁজে বাংলাদেশ, জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানি আমদানিতে বড় ধরনের চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সরকার এখন বিকল্প উৎস খোঁজা, আমদানি বহুমুখী করা এবং অভ্যন্তরীণ বণ্টন নিয়ন্ত্রণে একযোগে পদক্ষেপ নিচ্ছে। আপাতত মজুত ও চলমান চালান দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও এপ্রিল, মে ও জুন মাসের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।

বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই প্রণালির ওপর ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং চলমান সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি আমদানি এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশই এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সংকটটি দ্রুতই দেশের বাজারে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে সরকার রাশিয়া থেকে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতির অনুরোধ জানিয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার ওয়াশিংটনে পাঠানো এক চিঠিতে ছয় লাখ টন পর্যন্ত জ্বালানি আমদানির অনুমতি চাওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, “আমরা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দিয়েছি, এখন তাদের জবাবের অপেক্ষায় আছি।”

একই সঙ্গে বিকল্প উৎস নিশ্চিত করতে এশিয়া, আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে সরকার। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, কাজাখস্তান, অ্যাঙ্গোলা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে অ্যাঙ্গোলা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে এলএনজি চালান আসার বিষয়টি ইতোমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ১১টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করেছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দ্রুত সরবরাহের নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত এপি এনার্জি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড থেকে ১ লাখ টন এবং সুপারস্টার ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ থেকে ২ লাখ টন ডিজেল আমদানির অনুমোদন মিলেছে। অন্যান্য প্রস্তাব এখনো অনিশ্চয়তায় রয়েছে।

ভারত থেকেও জ্বালানি আমদানির চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে ৬০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের চুক্তি থাকলেও শুরুতে মাত্র পাঁচ হাজার টন পাওয়া যায়। পরে পাইপলাইন ও সমুদ্রপথে অতিরিক্ত চালান আসায় এখন পর্যন্ত মোট আমদানি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার টনে।

এদিকে ইন্দোনেশিয়া থেকে আরও দুটি চালান আসার কথা রয়েছে। প্রতিটি চালানে প্রায় ছয় হাজার টন জ্বালানি থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি মালয়েশিয়া থেকেও অতিরিক্ত সরবরাহের আশা করা হচ্ছে, যার ফলে এপ্রিল মাসে মোট আমদানির পরিমাণ এক লাখ টনের বেশি হতে পারে।

চট্টগ্রাম বন্দরে জ্বালানি জাহাজের আনাগোনা বেড়েছে। গত মঙ্গলবার ভোরে মালয়েশিয়া থেকে প্রায় ২৭ হাজার ৩০০ টন ডিজেল নিয়ে একটি ট্যাংকার বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছেছে। ৩ এপ্রিল আরও একটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে। বন্দর সূত্র জানায়, ৩ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত ৩০টির বেশি জাহাজ জ্বালানি নিয়ে বন্দরে এসেছে।

তবে সরবরাহ বাড়লেও বাজারে চাপ কমেনি। বিশেষ করে অকটেন সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ যানবাহনের সারি দেখা যাচ্ছে। পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চট্টগ্রাম বিভাগের সদস্যসচিব মোহাম্মদ মাইনুদ্দিন বলেন, “ডিজেলের কোনো সংকট নেই, কিন্তু অকটেনের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম।”

সরকার অভ্যন্তরীণ বণ্টন নিয়ন্ত্রণে কিউআর কোডভিত্তিক ‘ফুয়েল পাস’ চালুর পরিকল্পনা করছে। এতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি কেনা যাবে এবং বারবার কেনার সুযোগ সীমিত থাকবে। একই সঙ্গে কৃষিখাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আমদানি বাড়ালেই সংকট কাটবে না। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, “আমাদের ডিজেল পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুষ্ঠু বণ্টন ও অবৈধ মজুত নিয়ন্ত্রণ করা। সংকটের সময় এসব কার্যক্রম পরিস্থিতি আরও খারাপ করে।”

তিনি আরও বলেন, “সরকারের সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। যারা অবৈধভাবে জ্বালানি মজুত করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।”

এদিকে এলএনজি ও এলপিজি সরবরাহেও চাপ তৈরি হয়েছে। দেশে প্রতিদিন প্রায় ৪৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট। এলএনজি থেকে আসা গ্যাসের পরিমাণও কমে গেছে। বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানির খরচও বেড়েছে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও বাংলাদেশের জন্য চাপ তৈরি করছে। ইতোমধ্যে নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশে জ্বালানির দাম ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ফিলিপাইন জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে, কিউবায় মজুত সংকট দেখা দিয়েছে।

তবে সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দেশে প্রায় এক দশমিক ৩৭ লাখ টন ডিজেলের মজুত রয়েছে, যা স্বল্পমেয়াদে সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, “নিকট ভবিষ্যতের জন্য আমরা জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পেরেছি, মানুষকে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।”

তবে মে ও জুন মাসে সরবরাহ পরিস্থিতি কেমন হবে, তা এখনো অনিশ্চিত বলেই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকার সাশ্রয়ী ব্যবস্থাও বিবেচনায় রেখেছে। সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো, হোম অফিস চালু করা এবং অনলাইন ক্লাস চালুর মতো পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা চলছে।

সব মিলিয়ে, স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলেও মধ্যমেয়াদে পরিস্থিতি নির্ভর করছে বৈশ্বিক বাজার, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর।