লোকসানে আলুর চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষক

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৬ এপ্রিল, ২০২৬, ০৮:০৬ এএম
লোকসানে আলুর চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষক

বিপুল লোকসানে আলু চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে কৃষক। অথচ এক মৌসুমের উৎপাদিত আলু সারা বছরের দেশের মানুষের খাবারের জোগান নিশ্চিত করে। ফলে এ ফসলের আবাদ কমে গেলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা থাকে। কিন্তু আলুর দাম না পেয়ে উৎপাদনকারী কৃষকের গলার ফাঁসে পরিণত হয়েছে আলু। এক কেজি আলু উৎপাদনে যেখানে গড়ে ১৫ থেকে ১৬ টাকা খরচ হয়েছে, সেখানে আলু বিক্রি হচ্ছে ৪ থেকে ৮ টাকা কেজি। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে কৃষককে ৮ থেকে ১১ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। যদিও ঢাকাসহ সারা দেশের খুচরা বাজারগুলোতে ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি হচ্ছে। আলুর এই দাম গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ দশমিক ২২ শতাংশ কম। কৃষি বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, টানা দুই বছর ধরে মোটা লোকসান গুনছে আলু চাষীরা। ফলে তারা কমিয়ে দিচ্ছে আলুর চাষ। তাতে পরবর্তী বছরগুলোতে বিপর্যয় দেখা দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে আলুচাষিদের নিরাপত্তা এবং খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে তেমন উদ্যোগ নেই। বরং সরকারের নীতি গ্রহণে অনীহা, প্রণোদনার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা বাস্তবায়ন না করা কৃষককে আলু চাষে ব্যাপকভাবে নিরুৎসাহিত করার অভিযোগ উঠেছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আলুর আবাদ হয় ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯১২ হেক্টর জমিতে। যা তার আগের বছরের চেয়ে ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি ছিল। ওই সময় ১ কোটি ১৫ লাখ ৭৩ হাজার ৬১৫ টন আলু উৎপাদন হয়। তার মধ্যে দেশে ৮৫ থেকে ৯০ লাখ টন খাবার আলুর চাহিদা রয়েছে। কিন্তু রপ্তানিতে পিছিয়ে থাকাসহ অতিরিক্ত উৎপাদিত আলুর ব্যবস্থাপনা ঘাটতি থাকায় কৃষক আলুর দাম পায়নি। এ বছর আলুর ফলন ভালো হলেও সামপ্রতিক বৃষ্টি কিছু আলুর ক্ষতি করেছে। যা মোট উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। রংপুর অঞ্চলে দেশের আলুর চাষ বেশি হয়। ওই বিভাগ থেকে মোট উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকই পাওয়া যায়।

সূত্র জানায়, গত বছর দাম না পাওয়ার কারণে এবার রংপুর অঞ্চলে আলুর আবাদ কম হয়েছে। রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় এবার আলুর চাষ হয়েছে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮৫ হেক্টর জমিতে। তাতে মোট উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৫৬ লাখ ৬৮ হাজার ৯৯২ টন। তার মধ্যে রংপুর জেলায় আলু চাষ হয়েছে ৫৪ হাজার ৫০ হেক্টরে, যা গত বছর ছিল ৬৬ হাজার ২৮০ হেক্টর। অর্থাৎ এবার রংপুর জেলায় ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়নি। কারণ উৎপাদিত আলুতে কৃষকের অর্ধেক টাকাই গচ্চা গেছে। এখন ওসব চাষীদের অনেকেই ঋণের টাকা পরিশোধ নিয়ে চিন্তিত। দাম না পেয়ে এবার অনেক কৃষকই হিমাগারে রাখছে না আলু। কেউ কেউ বাড়িতেই স্তূপ করে রেখে দিয়েছে আলু। আলু উৎপাদনকারী আরেক জেলা মুন্সীগঞ্জেও এখন আলু তোলার ধুম পড়েছে। তবে দাম কম থাকায় কৃষকের মুখে নেই হাসি। গেল বারের লোকসানের পর এবার আরেক দফায় লোকসানে পড়ে ভালো ফলনও কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে। কারণ দাম কম থাকার পরও জমিতে মিলছে না পাইকারের দেখা। সব মিলে লাভের আশা গুড়েবালি।

সূত্র আরো জানায়, আলু দামে ধস নামায় গত বছরই কৃষকরা ব্যাপকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ে। ওই ক্ষতি পুষিয়ে দিতে অন্তর্বর্তী সরকারের কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দুটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তার মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় আলুচাষিদের জন্য নিয়মিত বরাদ্দের পাশাপাশি ১১০ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু কৃষক ওই ভর্তুকির সুবিধা পায়নি। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা দেয়া হলেও সেটা বাস্তবায়ন হয়নি। একই সময়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ৫০ হাজার টন আলু কিনে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের মাধ্যমে বিক্রি করার ঘোষণা দিয়েছিল। পরে এই আলু আর কেনা হয়নি। ফলে এখন নতুন আলু উঠলেও কোল্ড স্টোরেজগুলোতে গত বছরের পুরনো আলুও রয়ে গেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠকে কৃষকদের এ অবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তার মধ্যে বৃষ্টিতে যেসব অঞ্চলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের আলু কিনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করার একটা সিদ্ধান্ত হয়েছে। 

এদিকে ভিয়েতনাম সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের আলু রফতানির জন্য তাদের বাজার উন্মুক্ত করেছে। ভিয়েতনামের কৃষি ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় ২৭ মার্চ বাংলাদেশ থেকে আলু আমদানির অনুমোদন দেয়। হ্যানয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ লুৎফর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।  ভিয়েতনামের বিধি অনুযায়ী কোনো দেশ আলু রফতানি করতে চাইলে তাদের কৃষি ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধন সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয় এবং কর্তৃপক্ষ সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে সন্তুষ্ট হলে অনুমোদন দেয়। হ্যানয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ২০২৫ সালের মে মাসে নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু করে। ওই প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় এখন বাংলাদেশ ভিয়েতনামে আলু রফতানির জন্য যোগ্যতা অর্জন করেছে। ভিয়েতনামে আলুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে এবং ওই রফতানি উদ্যোগ দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসে সহায়ক হবে।

অন্যদিকে কৃষি অর্থনতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খানের মতে, উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে সরকারকে নীতি সহায়তা দিতে হবে। সেটা প্রযুক্তিগত হতে পারে, ভর্তুকিও হতে পারে। কৃষক এভাবে ধারাবাহিক লোকসানে পড়লে আলু উৎপাদন কমবে, দামে অস্থিরতা তৈরি হবে, যা আসলে খাদ্য নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করবে।

এ বিষয়ে কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু জানান, আলুর উৎপাদন খরচ কমাতে হবে। তা না হলে কৃষক আলুতে লাভ করতে পারবে না। তাছাড়া উৎপাদন ধরে রাখতে সরকারকে আলুচাষিদের ভর্তুকি প্রদান করতে হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে