ইউরোপ গেম

স্বপ্নভঙ্গের নির্মম বাস্তবতা

এফএনএস | প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ০৮:২১ পিএম
স্বপ্নভঙ্গের নির্মম বাস্তবতা

উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপমুখী বাংলাদেশি যুবকদের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, এই প্রবণতা এখন এক ভয়াবহ মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। দালালচক্রের প্রলোভনে পড়ে অবৈধ পথে ইউরোপ যাত্রা-যা স্থানীয়ভাবে ‘ইউরোপ গেম’ নামে পরিচিত-শত শত পরিবারকে নিঃস্ব করছে, কেড়ে নিচ্ছে অগণিত প্রাণ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি প্রবেশকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেও অধিকাংশ অভিবাসনপ্রত্যাশী কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান তো পানই না, বরং পড়েন প্রতারণা, নির্যাতন ও অনিশ্চয়তার ফাঁদে। অনেকের শেষ পরিণতি হয় সাগরে মৃত্যু-যার কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসাবও নেই। এ বাস্তবতা নিছক দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি সংগঠিত মানব পাচার চক্রের নির্মম ফলাফল। এর কারণ হিসেবে দেখা যায়, দালালচক্রের সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। তারা সহজেই তরুণদের উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিচ্ছে। এবংকি দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা ও দ্রুত সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা অনেক যুবককে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে প্রলুব্ধ করছে। এছাড়াও সচেতনতার ঘাটতি এবং তথ্যপ্রবাহের সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সরকারি অবস্থান অনুযায়ী, অবৈধ পথে যাত্রা করলে আইনি সহায়তা সীমিত হয়ে পড়ে-যা বাস্তবসম্মত হলেও দায় পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, মানব পাচার রোধ, দালালচক্র নির্মূল এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। অথচ দেখা যাচ্ছে, হাজার হাজার মামলা বছরের পর বছর ঝুলে আছে; তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি পাচারকারীদের জন্য একপ্রকার উৎসাহ হিসেবে কাজ করছে। একই সঙ্গে পরিবারের ভূমিকাও অস্বীকার করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যরাই বড় অঙ্কের অর্থ জোগাড় করে তরুণদের বিদেশ পাঠাতে উৎসাহিত করেন, ঝুঁকির বিষয়টি জেনেও। ফলে বিপর্যয় নেমে এলে তা শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক সংকটেও রূপ নেয়। সমাধানের জন্য বহুমাত্রিক উদ্যোগ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে মানব পাচারবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে-যেখানে ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। এবং বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তরুণদের বিকল্প পথ দেখাতে হবে। ‘ইউরোপ গেম’ কোনো স্বপ্নপূরণের পথ নয়; এটি একটি বিপজ্জনক মরীচিকা। এই বাস্তবতা যত দ্রুত সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছানো যাবে, তত দ্রুত কমবে অপ্রয়োজনীয় প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ধ্বংস। এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সামাজিক সচেতনতার জোরালো বিস্তার।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে