সক্ষমতা শেষ, তবুও চলছে বর্জ্য ফেলা

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৭ মে, ২০২৬, ০৮:২৬ এএম
সক্ষমতা শেষ, তবুও চলছে বর্জ্য ফেলা

সক্ষমতার সীমা অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে রাজধানীর দুই প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র আমিনবাজার ও মাতুয়াইলের, তবুও থামছেনা ময়লা ফেলা। প্রতিদিন নতুন বর্জ্যরে চাপ বাড়ছে, আর তার প্রভাব পড়ছে আশপাশের পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও নগরজীবনে। কোথাও জায়গা ফুরিয়ে স্তূপ উঁচু হচ্ছে, কোথাও আবার বর্জ্য পোড়ানোর ধোঁয়ায় দুর্ভোগে পড়ছেন স্থানীয়রা।

রাজধানীর উত্তর ও পশ্চিম অংশের বড় একটি এলাকার বর্জ্য এখনো আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে নেওয়া হচ্ছে। বাসাবাড়ি, বাজার, অফিস-আদালত ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করা ময়লা বিভিন্ন সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন ঘুরে শেষ পর্যন্ত জমা হচ্ছে সেখানে। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক ট্রাক ঢ়ুকছে এ কেন্দ্রে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্ধারিত ধারণক্ষমতা বহু আগেই শেষ হয়েছে।

এখন সেখানে বর্জ্যরে স্তূপ অস্বাভাবিকভাবে উঁচু হয়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও তা নিরাপদ সীমার অনেক ওপরে চলে গেছে। এতে ধস, আগুন কিংবা দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে। দীর্ঘদিন জমে থাকা বর্জ্য থেকে মিথেনসহ বিভিন্ন গ্যাস বের হচ্ছে, যা পরিবেশের পাশাপাশি জলবায়ুর জন্যও ক্ষতিকর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ল্যান্ডফিল দীর্ঘসময় অতিরিক্ত ব্যবহার করলে মাটির নিচেও ক্ষতি হয়। বর্জ্য থেকে তৈরি তরল পদার্থ আশপাশের জলাধার কিংবা ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে যেতে পারে। এতে পানি দূষণের ঝুঁকি তৈরি হয়।

রাজধানীর দক্ষিণ-পূর্ব অংশে থাকা মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের অবস্থাও উদ্বেগজনক। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য পোড়ানো হয়। প্লাস্টিক, পলিথিন ও মিশ্র আবর্জনা পোড়ালে ঘন কালো ধোঁয়া তৈরি হয়, যা বাতাসে ছড়িয়ে আশপাশের আবাসিক এলাকায় পৌঁছে যায়।

বাসিন্দাদের দাবি, অনেক সময় ঘরের জানালা-দরজা বন্ধ রেখেও ধোঁয়া ও দুর্গন্ধ ঠেকানো যায় না। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালি, পোড়া বর্জ্যরে ধোঁয়া এবং দূষিত বাতাস একসঙ্গে মিলে পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলছে।

পরিবেশবিদদের মতে, ঢাকার বায়ুদূষণের পেছনে যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা ও শিল্পকারখানার দূষণের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও বড় কারণ। খোলা জায়গায় আবর্জনা পোড়ালে বাতাসে ক্ষতিকর কণা ছড়িয়ে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম জানিয়েছেন, বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তার দাবি, প্রতিদিন উৎপাদিত বর্জ্যরে বড় অংশ প্রক্রিয়াজাত করে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে দুর্গন্ধ ও পরিবেশদূষণ কমানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু পরিকল্পনা ঘোষণা করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। প্রতিদিন যেভাবে বর্জ্যরে পরিমাণ বাড়ছে, তাতে পুরোনো পদ্ধতিতে এই সংকট মোকাবিলা অসম্ভব। উৎস পর্যায়ে বর্জ্য আলাদা করা, পুনর্ব্যবহারযোগ্য অংশ পুনরুদ্ধার, জৈব বর্জ্য কম্পোস্টে রূপান্তর এবং আধুনিক স্যানিটারি ল্যান্ডফিল গড়ে তোলা জরুরি।

পরিবেশবিদ অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেছেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার কারণে নগরবাসীর স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তার মতে, বড় ল্যান্ডফিল ছাড়াও ছোট ছোট ডাম্পিং সাইটে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বর্জ্য পোড়ানো দূষণ বাড়াচ্ছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ল্যান্ডফিলের আশপাশে বসবাসকারী মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘদিনের। একটি এলাকার মানুষকে বছরের পর বছর এমন পরিবেশে রেখে দেওয়া যায় না। দ্রুত বিকল্প আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে বর্জ্য সমস্যা ভবিষ্যতে বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে। জনসংখ্যা ও ভোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বর্জ্যও। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া রাজধানীর এই সংকট কাটানো কঠিন হবে।