চট্টগ্রামের রাজনীতিতে এমন কিছু মানুষের নাম আছে, যারা কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন না, বরং সাধারণ মানুষের আস্থা, আবেগ ও ভালোবাসার প্রতীকে পরিণত হন। সময়ের পালাবদল, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা কিংবা দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পেরিয়েও যাদের জনপ্রিয়তা তৃণমূলের হৃদয়ে অটুট থাকে, তাদেরই একজন বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ও চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনের এমপি অধ্যাপক লায়ন মোঃ আসলাম চৌধুরী। সীতাকুণ্ড থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনপদে এখনও উচ্চারিত হয় একটি পরিচিত স্লোগান, দুর্দিনের আসলাম ভাই, সুখে-দুঃখে যাকে পাই। স্থানীয়দের মতে, এটি কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, ত্যাগ, সহমর্মিতা ও মানুষের পাশে থাকার বাস্তব প্রতিচ্ছবি। আন্দোলন-সংগ্রামের কঠিন সময়ে গ্রেপ্তার নেতাকর্মীদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, মামলা মোকাবিলায় সহযোগিতা করা, অসুস্থ কর্মীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং হতাশ নেতাকর্মীদের সাহস জোগানোর কারণেই তৃণমূলের সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
সীতাকুণ্ডের এক প্রবীণ কৃষক বলেন, আমরা বড় রাজনীতি বুঝি না, কিন্তু কে মানুষের পাশে থাকে সেটা বুঝি। আসলাম চৌধুরী গরিব-অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন বলেই মানুষ তাকে মনে রেখেছে। অনেকেই নামাজ পড়ে তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঈদ, রমজান কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সাধারণ মানুষের খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করতেন তিনি। অসচ্ছল পরিবারের মাঝে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহযোগিতা, এতিম শিশুদের পাশে দাঁড়ানো এবং চিকিৎসা ব্যয়ে সহায়তার মতো নানা মানবিক কর্মকাণ্ডের কারণে দল-মত নির্বিশেষে বহু মানুষের কাছে তিনি প্রশংসিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসলাম চৌধুরীর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ তার তৃণমূলনির্ভর রাজনীতি। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে থাকলেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখার কারণেই তিনি এখনও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী, শ্রমিক, শিক্ষক, কৃষক ও তরুণদের অনেকেই মনে করেন, মানুষের সঙ্গে সহজ সম্পর্ক গড়ে তোলার বিরল ক্ষমতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি ছিল দীর্ঘ কারাজীবন। তবে সেই সময়েও নেতাকর্মীদের ভালোবাসা কমেনি; বরং আরও বেড়েছে বলে দাবি দলীয় নেতাকর্মীদের। তাদের ভাষ্য, কারাগারে থেকেও তিনি নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নিতেন এবং বন্দী নেতাকর্মীদের জামিন ও আইনি সহযোগিতার বিষয়েও ভূমিকা রাখতেন। এমনকি কারাগার থেকে চিরকুট লিখে নেতাকর্মীদের পরিবারকে সাহস জোগানোর ঘটনাও তৃণমূলে ব্যাপক আলোচিত হয়। কারামুক্তির দিন প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজারো নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সেই দৃশ্য প্রমাণ করে, ভালোবাসা দিয়ে গড়ে ওঠা সম্পর্ক রাজনৈতিক প্রতিকূলতা দিয়ে মুছে ফেলা যায় না।
রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও একজন শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক হিসেবেও রয়েছে তার আলাদা পরিচিতি। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহযোগিতা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা এবং মেধাবীদের উৎসাহ দেওয়ার বিষয়টি এখনও স্মরণ করেন স্থানীয় অভিভাবকরা। বিশেষ করে আন্দোলন-সংগ্রামে নিহত ও নির্যাতিত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টি আবেগ নিয়ে স্মরণ করেন অনেকে। এক শহীদ পরিবারের সদস্য বলেন, অনেকেই আশ্বাস দিয়েছেন, কিন্তু কজন সত্যিকার অর্থে পাশে থেকেছেন? আসলাম ভাই অন্তত আমাদের ভুলে যাননি। এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে আসলাম চৌধুরীকে ঘিরে ঋণ খেলাপি বিতর্ক। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের দাবি, তিনি প্রকৃত অর্থে ঋণ খেলাপি নন, বরং রাজনৈতিকভাবে দুর্বল ও জনবিচ্ছিন্ন করতে পরিকল্পিতভাবে তাকে আইনি জটিলতার মুখোমুখি করা হয়েছে।
দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকায় তার ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যাংকিং লেনদেনে জটিলতা তৈরি হওয়ায় আর্থিক সংকট বাড়তে থাকে। পরে সেই পরিস্থিতিকেই “ঋণ খেলাপি”তকমা দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি তাদের। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজপথের আন্দোলনে ধারাবাহিক সক্রিয়তা, তৃণমূল পর্যায়ে শক্ত অবস্থান এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার কারণেই তাকে নানা রাজনৈতিক চাপ ও বিতর্কের মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিশেষ করে সরকারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পর থেকেই মামলা, গ্রেপ্তার ও দীর্ঘ কারাবাসের মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হন তিনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করে আবারও নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করেন আসলাম চৌধুরী। স্থানীয়দের মতে, প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও সাধারণ ভোটাররা তাকে ব্যাপক সমর্থন দিয়েছেন। তবে ঋণ খেলাপি সংক্রান্ত আইনি জটিলতার কারণে আদালতের নির্দেশে ফলাফল স্থগিত হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় রাজনৈতিক অঙ্গনে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক জহুরুল আলম জহুর বলেন, অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি তৃণমূলের মানুষের আশা-ভরসার প্রতীক। আন্দোলন-সংগ্রামের প্রতিটি কঠিন সময়ে তিনি নেতাকর্মীদের সাহস জুগিয়েছেন এবং সাধারণ মানুষের পাশে থেকেছেন। কারাগারের ভেতরে থেকেও তিনি দলের নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নিয়েছেন, অসহায় পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। তার রাজনীতি ব্যক্তিস্বার্থের নয়, মানুষের অধিকার ও কল্যাণের রাজনীতি। এজন্যই আজও সীতাকুণ্ডসহ পুরো চট্টগ্রামের মানুষ তাকে নিজেদের আপন মানুষ হিসেবে মনে করে।
তিনি আরও বলেন, ইনশাআল্লাহ, সত্য ও ন্যায়ের রাজনীতির মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আমরা কাজ করে যাব। মানুষের ভালোবাসাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। সাধারণ মানুষের মতে, রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও অসহায় মানুষের চিকিৎসা সহায়তা, শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা, ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা এবং সংকটকালে মানবিক ভূমিকার কারণেই আসলাম চৌধুরীর প্রতি মানুষের আস্থা এখনও অটুট রয়েছে।
সীতাকুণ্ডের এক তরুণ বলেন, নেতা অনেকেই হন, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারেন খুব কম মানুষ। আসলাম ভাইকে মানুষ এজন্যই এখনও নিজের মানুষ মনে করে। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে সময়ের পরিক্রমায় অনেক নাম হারিয়ে গেলেও, তৃণমূলের ভালোবাসায় আজও জীবন্ত এক নাম, অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী এমপি।