বাংলাদেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। গৃহস্থালি নির্যাতন থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনপরিসর- সবখানেই নারী ও শিশুরা নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে। এ বাস্তবতা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং সামাজিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য বড় অশনিসংকেত। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার মূল কারণ বহুমাত্রিক। সামাজিক বৈষম্য ও অর্থনৈতিক নির্ভরতা তাদের দুর্বল অবস্থানে ঠেলে দেয়। অনেক সময় দেখা যায়, ভুক্তভোগীরা সামাজিক লজ্জা বা ভয়ভীতির কারণে অভিযোগ করতে সাহস পান না। আবার অভিযোগ করলেও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আইন প্রয়োগে দুর্বলতা এবং সাংস্কৃতিক মানসিকতা, যা সহিংসতাকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। শারীরিক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, বাল্যবিবাহ- এসব তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অক্ষম করে দেয়। একটি সমাজে যদি নারী ও শিশু নিরাপদ না থাকে, তবে সেই সমাজ কখনোই টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে না। এখন জরুরি হলো কার্যকর পদক্ষেপ। প্রথমত, আইন প্রয়োগে কঠোরতা নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে সমাজে ভয় তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে- পরিবার ও সমাজে নারী-শিশুর প্রতি সম্মান ও সহমর্মিতা বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন জরুরি। নারীদের কর্মসংস্থান ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করলে তারা নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবেন। চতুর্থত, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে, যাতে ভুক্তভোগীরা নতুন করে জীবন শুরু করতে পারেন। আমরা মনে করি, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে নিছক প্রতিশ্রুতি নয়, চাই বাস্তব পদক্ষেপ। আইন, সমাজ ও রাষ্ট্র- তিনটি স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ করা। সহিংসতা রোধে পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় নারী-পুরুষ সমতার মূল্যবোধ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। গণমাধ্যমকে সচেতনতা বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সমাজে নৈতিকতা ও মানবিকতা ফিরিয়ে আনতে হবে।