দেশে কিশোর অপরাধের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা একটি গভীর সামাজিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক আইন কমিশনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হত্যা, ধর্ষণসহ গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতা কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জই নয়, বরং আমাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতাকেও সামনে নিয়ে আসে। আইন কমিশনের গবেষণায় শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে অবস্থানরত কিশোরদের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই প্রবণতা উঠে এসেছে। বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়, এসব প্রতিষ্ঠানে ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি কিশোর অবস্থান করছে, যা পুনর্বাসন ও সংশোধনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সংশোধনাগারগুলোতে প্রয়োজনীয় মানসিক, সামাজিক ও শিক্ষামূলক সহায়তা না থাকলে এগুলো প্রকৃত অর্থে সংশোধনের পরিবর্তে অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে পারিবারিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, সামাজিক অবক্ষয় এবং মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যাসহ নানা কারণ কাজ করে। কিন্তু গবেষণাগুলোতে এসব কারণের গভীর বিশ্লেষণ অনুপস্থিত। ফলে সমস্যার মূল উৎস চিহ্নিত না করে কেবল আইনি কাঠামো পরিবর্তনের ওপর জোর দিলে তা দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও দিতে পারে। তবে আইনি কাঠামোর অসঙ্গতিও উপেক্ষা করার মতো নয়। বর্তমানে বিভিন্ন আইনে শিশুর সংজ্ঞায় ভিন্নতা বিদ্যমান, যা বিচার ও অধিকার নিশ্চিতকরণে বিভ্রান্তি তৈরি করে। এই অসামঞ্জস্য দূর করা জরুরি। কিন্তু কেবল বয়সসীমা কমানো বা বাড়ানোর মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে-এমন ধারণা সরলীকৃত। বরং প্রয়োজন একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে আইনি সংস্কারের পাশাপাশি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে কিশোরদের দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তায় না রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। বিলম্বিত বিচার অনেক ক্ষেত্রে তাদের মানসিক অবস্থাকে আরও জটিল করে তোলে। পুনর্বাসন ব্যবস্থাকে উন্নত বিশ্বের মানদণ্ডে উন্নীত করা এবং দক্ষ জনবল নিয়োগের মাধ্যমে কিশোরদের ইতিবাচক পথে ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো-কিশোর অপরাধকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে না দেখে একটি সামগ্রিক সামাজিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্র-সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এর কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়। অতএব, কিশোর অপরাধ মোকাবিলায় প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক গবেষণা, সুসংহত আইন, কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। তা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।