গ্রীষ্মের রুক্ষতা ছাড়িয়ে কৃষ্ণচূড়া ফুল নিজের সৌন্দর্য তুলে ধরছে। গাছের ডালপালা জুড়ে শুধুই কৃষ্ণচূড়া ফুলের সমারোহ। এই ফুলের অপরুপ দৃশ্য যে কারও চোখে ও মনে এনে দিতে পারে শিল্পের দ্যোতনা। ঝিনাইদহ কালীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন প্রথে প্রান্তরে ও স্থানীয়দের বসত বাড়ির আঙ্গিণায় শোভা পাচ্ছে এসব রক্তলাল ফুল সমৃদ্ধ অসংখ্য কৃষ্ণচূড়া গাছ। এ যেন এক অপরুপ মনমুগ্ধকর ভালবাসার অনুভুতির ছোঁয়া। আর এসব কৃষ্ণচূড়া ফুলের নিজস্ব সৌন্দর্য উপভোগ করছেন পুলপ্রিয় পথিক। প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়েছে কৃষ্ণচূড়ার জৌলুস।
কালীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, কৃষ্ণচূড়ার গাছে থোকায় থোকায় ফুল ফুঁটেছে। সবুজের বুকে শুধুই লালের রাজত্ব।দূর থেকে মনে হয় ময়ূর তার রাঙা পেখম মেলে ধরেছে প্রকৃতির মাঝে।লক্ষ্য করা গেছে,আলাইপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে কৃষ্ণচূড়া ফুলের সমারোহ। কৃষ্ণচূড়া ফুলে গাছের ডালগুলো নিয়ে নুয়ে পড়েছে।কৃষ্ণচূড়া বাঙালির কাছে অতিপরিচিত একটি ফুল। বাঙালির কবিতা, সাহিত্য,গান ও নানা উপমায় এর রূপের মোহনীয় বর্ণনা বিভিন্ন ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মোহনীয় রূপে প্রকৃতির শোভা বর্ধনকারী এ বৃক্ষ এখনো গ্রাম বাংলার পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়। প্রকৃতিতে গ্রাষ্মের ছোঁয়া পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই কৃষ্ণচূড়া তার রক্তিম আভা ছড়ানোর মাধ্যমে জানান দেয়-সে এখনও টিকে আছে প্রকৃতিকে সাজাবে বলে।
কৃষ্ণচূড়া ফুলের পাপড়ি লাল-হলুদ রঙয়ের হয়ে থাকে। এর ভেতরে অংশে হালকা হলুদ রঙের হওয়ায় দূর থেকে দেখলে মনে হয় গাছে যেন লাল আগুন জ্বলছে।ঋতুচক্রের আবর্তনে কৃষ্ণচূড়া তার মোহনীয় সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হয়েছে প্রকৃতির মাঝে।অনেকেই সারাদিনের গরম আর ক্লান্তি শেষে পথিকরা কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বসে একটু বিশ্রাম নেন।বিকাল হলেই অনেকেই কৃষ্ণচূড়ার সঙ্গে ছবি তুলতে ছুটে আসেন তরুণ-তরুণীরা।এসব ছবি কেউ ফ্রেম করে রেখে দেন, আবার কেউ পোস্ট করেন বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
বিশেষ করে শৈলকুপা উপজেলার উমেদপুর ইউনিয়নের লক্ষণদিয়া গ্রাম। প্রকৃতির সবুজে ঘেরা এক শান্ত জনপদ। চারদিকে গাছপালা থাকলেও এই গ্রামের একজন মানুষ দেখেছিলেন ভিন্ন এক স্বপ্ন।তিনি শুধু সবুজ নয়-সবুজের বুক চিরে ফুটে উঠুক কৃষ্ণচূড়ার উজ্জ্বল লাল,যেন পুরো গ্রাম একদিন রূপ নেয় এক অনন্য নান্দনিকতায়। স্বপ্নবাজ সেই মানুষটির নাম আমিনুল ইসলাম।নিজের ব্যক্তিগত অর্থ,সময় ও শ্রম দিয়ে বছরের পর বছর ধরে গ্রামের বিভিন্ন রাস্তার ধারে,খোলা জায়গায়,শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশে লাগাতে থাকেন কৃষ্ণচূড়ার চারা।
আমিনুল আসলামের ইচ্ছাছিল লক্ষণদিয়াকে‘কৃষ্ণচূড়ার গ্রাম’হিসেবে পরিচিত করা।কয়েক বছর পর গাছগুলো বড় হয়ে যখন ফুলে ভরে উঠবে,তখন লাল রঙে ঢেকে যাবে গ্রামের পথঘাট। সেই সৌন্দর্য দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসবে মানুষ। সেই স্বপ্ন নিয়ে গ্রামের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১ হাজার কৃষ্ণচুড়া গাছ লাগান তিনি। যত্নে বড় করতে থাকেন। কিন্তু কিছুদিন যেতেই শুরু হয় দুর্বৃত্তদের নির্যাতন। গাছের গোড়ায় দেওয়া হয় বিষাক্ত কেমিকেল। ফলে ধীরে ধীরে মরতে থাকে গাছগুলো। বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ৫০টির মত গাছ। যা এলাকায় সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে।প্রকৃতিপ্রেমী আমিনুল ইসলাম বলেন,অনেক কষ্ট করে,নিজের টাকায় গাছগুলো লাগিয়েছিলাম। যত্নে বড় করেছি। কিন্তু কিছু মানুষ গাছের গোড়ায় বিষ দিয়ে একে একে মেরে ফেলেছে। এটা শুধু গাছ ধ্বংস নয়,একটা স্বপ্ন ধ্বংস। যদি গাছগুলো বেঁচে থাকত,তাহলে আমাদের গ্রামটা আজ অনেক সুন্দর হতো। দেশের মানুষ এই গ্রামকে চিনত ‘কৃষ্ণচূড়া গ্রাম’ হিসেবে।লক্ষণদিয়ার পথে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছ আজও লাল হয়ে ফুটে ওঠে-কিন্তু সেই লালের মাঝে মিশে আছে হারিয়ে যাওয়া হাজারো স্বপ্নের কষ্ট। তবুও আশাবাদী আমিনুল ইসলাম। তিনি চান,নতুন করে আবার গাছ লাগাতে,আবারও স্বপ্ন দেখতে। কারণ,তার বিশ্বাস-একদিন হয়তো আবারও লাল হয়ে ফুটবে পুরো গ্রাম,আর লক্ষণদিয়া ফিরে পাবে তার পরিচয় ‘কৃষ্ণচূড়ার গ্রাম।
প্রকৃতির শোভা বর্ধনকারী এ বৃক্ষের উচ্চতা তেমন একটা বেশি হয় না। সর্বোচ্চ ১২ মিটার পর্যন্ত উপরে উঠলেও তার শাখা-প্রশাখা বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত থাকে। কৃষ্ণচূড়া পুরো গ্রীষ্ম ও বর্ষায় প্রকৃতিকে মাতিয়ে রাখে। সাধারনত পুল ফুটে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত। এই পুরো সময়টাতেই কৃষ্ণচূড়া প্রকৃতিকে মাতিয়ে রাখে উজ্জ্বল লাল আভায়।এপ্রিলে গ্রীষ্মের শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই সবুজ পাতার মাঝে বেরিয়ে আসতে থাকে লাল রঙের কৃষ্ণচূড়া ফুল। মানুষের দৃষ্টিগোচর হতে থাকে তার সৌন্দর্য। তখন আর আলাদা করে তার খোঁজ নেওয়ার দরকার হয় না। দূর থেকে দেখে মনে হয়-সবুজের বুকে হয়তো আগুন লেগেছে।মুশফিকুর রহমান মাহমুদ বলেন,এই কৃষ্ণচূড়া ফুল লাল ও হলুদ রঙয়ের হয়ে থাকে। আমরা না জেনে একে কৃষ্ণচূড়া বলে থাকি। লাল রঙয়ের ফুলকে কৃষ্ণচূড়া ও হলুদ রঙয়ের ফুলকে রাধাচূড়া বলা হয়। তবে হলুদ রঙে রাধাচূড়া এখন তেমন দেখা যায় না বলেই চলে। আমাদের দেশে এপ্রিল মে মাসে এই ফুল ফোটে। বছরের অনান্য সময় এই ফুল বা গাছ সচরাচর চোখে না পড়লেও এপ্রিল মে মাসে যখনি গাছে নতুন পাতা বা ফুল ফোটা শুরু করে তখনি যেন পথচারির নজর কাড়ে মনোমুগ্ধকর এই কৃষ্ণচূড়া।