গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বজড়া কঞ্চিবাড়ি গ্রামে কুকুরের কামড়ে মৃত ফুল মিয়ার স্ত্রী জমিলা খাতুন বলেন, গত কয়েক মাস আগে ছোট মেয়ে ফেন্সির বিয়ে কাবিন করে রেখেছি। চলতি বোরো ধান কাটামাড়ির পর বিয়ে তুলে দিব। কিন্তু হঠাৎ এক ঝড় এসে সে স্বপ্ন তছনছ করে দিয়ে গেল। ফেন্সি এবং ফাইমা দুটি মেয়ে সন্তান তাঁর। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে কয়েক বছর আগে। এখন এই অভিভাবকহীন পরিবারের দায় কে নিবেন, সে চিন্তায় দিশাহারা জমিলা খাতুন। হাট থেকে বাজার কিনে নিয়ে এসে দেয়ার লোক নেই তার। সংসার চালানোর মত জমি-জমা থাকলেও তা দেখভাল করার কাও নেই। জমিলা খাতুন দুঃখ করে বলেন, স্বামীকে বাঁচানোর জন্য আক্রান্তের পরপরই গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে সরকারি টিকা না পেয়ে বাইরের দোকান থেকে টিকা কিনে এনে শরীরের পুশ করি। কিন্তু নিয়তি আজ অভিভাবকহীন করে দিন। মেয়ে দুটি এতিম হয়ে গেল। তিনি আবেগ জরিত কন্ঠে বলেন, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আজও কোন প্রকার খোঁজ নেননি।
ফেন্সি বলেন, আমি ছোট মেয়ে বাবা আমাকে অনেক ধামধুম করে বিয়ে তুলে দিতে চেয়ে ছিলেন। কিন্তু হাঠৎ এক কালবৈশাখী ঝড় এসে আমার বাবাকে কেড়ে নিয়ে গেল। এ দুঃখ রাখব কোথায় আর কাকে বা বলবো। আমার কোন ভাই নেই বাবাই ছিলেন সব। আজ বাবা হারা হয়ে গেলাম। শুধু তাই নয়, এই পরিবারটি চিরদিনের জন্য অভিভাবক শুন্য হয়ে গেল।
কুকুরের কামড়ে মৃত সুলতানা বেগমের স্বামী সালাম মিয়া বলেন, আমার একটি ছেলে ও একটি মেয় সন্তান। ছেলেটিকে বিয়ে দিয়েঠি। মেয়েটি ছোট এখনো বিয়ের বয়স হয়নি। এর আগে আমার মেয়েটি এতিম হয়ে গেলে। কে নিবে আমার এই মেয়ের দেখভালের দায়িত্ব। আমি সংসারের রোজগার করি ঠিক। কিন্তু সংসার ঠিক রাখতেন আমার স্ত্রী। সে আজ নাই। মা হারা মেযেটিকে নিয়ে কঠিন দুশ্চিন্তা হয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সরকারি লোকজন সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করলে হয়তো চেষ্টা করে দেখা যেত, তাদেরকে বাঁচানো যেত কি না। কিন্তু তাদের অবহেলা এবং তদারকির অভাববোধটা নিজের মনকে আহত করে তুলেছে। শনিবার সমকালের সাথে কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পরেন কুকুরের কামড়ে মৃত রতনেশ্বরের মা রংমালা রানী। বয়েসের ভারে নুঁয়ে পড়া এই মা বলেন, আমি বেঁেচ থাকতে আমার সন্তান চলে গেলে এর চাইতে আর বড় দুঃখ হয় না। রতেনশ্বর ছিলেন পেশায় কাঠঁমিস্ত্রী। বাড়িভিটা ছাড়া আবাদী জমি নেই তাঁর। রতেনশ্বরের একমাত্র ছেলে মিলন। তাকে বিয়ে দিয়েছে, সেও কাঁঠমিস্ত্রীর কাজ করে। তাঁর স্ত্রী শোভারানী বলেন, কে জানে ভগবান তার স্বামীকে এভাবে কেড়ে নিবে। কিভাবে তার জীবন অতিবাহিত করবেন, সে চিন্তায় তিনি দিশেহারা। মৃত নন্দ রানীর ছেলে কনক ঢাকায় গার্মেন্সের চাকরি করত। কনকের মেয়েকে নিয়ে বাড়িতে থাকত নন্দরানী। নন্দ রানীর এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, অনেক আগে। বাড়ি দেখভাল করত নন্দ রানী। তাঁর ছেলে, কনক বলেন, মা মারা যাওয়ার পর আমার মেয়েটি ঠাকুর মার শোকে পাথর হয়ে গেছে। অভিভাবকহীন হয়ে গেল পরিবারটি। মৃত ঠেকানো যাবে না, তবে চেষ্টার অভাব ছিল হয়তো সমাজের দায়িত্বে থাকা লোকজনের। সেই জায়গাটায় অনেক ঘাটতি রয়েছে আমাদের।
তিন ছেলে সন্তানের জননী কুকুরের কামড়ে মৃত আফরুজা বেগম। টানাটানীর সংসারে অনেক কষ্ট করে ছেলেদের লেখাপড়াসহ ভাল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল। কিন্তু নিয়তি বড় বাধা হয়ে দাড়াল তিন ভাইয়ের জীবনে। মাকে হারিয়ে তিন ভাই শোকে কাতর হয়ে গেছে। সমকালের সাথে কথা বলেন, আফরুজার বড় ছেলে মনোরুল ইসলাম। মোনারুল ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। খবর পাওয়ার পরপরই বাড়ি এসে মা’কে বাঁচানোর অসম্ভাব চেষ্টা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য মা’কে বাঁচাতে পারেননি। তার বাবা মতিয়ার রহমান একা হয়ে পড়েছেন। স্ত্রীকে হারিয়ে তিনি দিশেহারা হয়ে গেছেন। মোনারুল আরও বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি, রংপুর হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় ও নাসদের আচার-আচারণ নিজকে কঠিনভাবে আহত করে তুলেছেন। কাকে বিচার দিব,আর বিচার দিয়েই বা কি লাভ হবে। তার দাবি আর যেন কোন মা’কে এভাবে প্রাণ হারাতে না হয়।
গত ২২ এপ্রিল বজড়া কঞ্চিবাড়ি গ্রামের ১৬জনকে একই দিনে কুকুরের কামড়ায়। ১৪ দিন পর গত ৬ মে নন্দরানী, ফুল মিয়া এবং ৮ মে রতনেশ্বর মারা যান। গত ১১ মে উপজেলা প্রশাসন এবং স্বাস্থ বিভাগ বিষয়টি জানার পর মৃত পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান করে। এরপর ১১ মে রাতে আফরুজা বেগম সর্বশেষ ১৩ মে সুলতানা বেগমের মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে তাদের পরিবারকেও ১০ হাজার টাকা সহায়তা দেয়া হয়। আক্রান্তরা হলেন ওই গ্রামের ফজিতন নেছা, রুমিনা বেগম, নজরুল ইসলাম, হামিদুল ইসলাম, গোলেনুর বেগম, মিতু বেগম, আতিকুর মিয়া, লাবন্য আকতার, বিজয় হোসেন, জয়নাল আবেদীন, চাদনী বেগম।
গত শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে গাইবান্ধা-১ সুন্দরগঞ্জ আসনের এমপি মো, মাজেদুর রহমান ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা বজড়া কঞ্চিবাড়ি গ্রামে কুকুরের কামড়ে মৃত পাঁচজন এবং আক্রান্ত নয়জনের পরিবারের সদস্যদের ইউনিয়ন পরিষদে ডেকে এনে খোঁজ খবর নেন। সেই সাথে মৃত পরিবারকে ১৫ হাজার এবং আক্রান্ত পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদান করেন। এর আগে স্থানীয় এমপি ও উপজেলা প্রশাসন মৃত পাঁচ পরিবারের বাড়িতে গিয়ে ১০ হাজার করে টাকা প্রদান করেছেন। এনিয়ে মৃত পাঁচ পরিবার পেল ২৫ হাজার টাকা। সেই সাথে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে টিকা কেনার জন্য উপজেলা প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তরকে ২৫ হাজার টাকা প্রদান করা হয়।