নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলায় সমাজসেবা বিভাগের বিভিন্ন ভাতা কার্যক্রমে অনিয়ম ও দুর্নীতির যে অভিযোগ উঠেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং রাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের সতর্কসংকেত। প্রতিবন্ধী, বিধবা ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দকৃত ভাতা মূলত সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষের সহায়তায় রাষ্ট্রের মানবিক উদ্যোগ। কিন্তু সেই ব্যবস্থাই যদি দুর্নীতির হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা শুধু বঞ্চিতই হন না, রাষ্ট্রীয় সহানুভূতির ভিত্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যনুযায়, ভাতা কার্ড করে দেয়ার নামে টাকা আদায়, অযোগ্য ব্যক্তিদের নামে প্রতিবন্ধী কার্ড ইস্যু এবং কম্পিউটারে তৈরি ভূয়া কার্ডের মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলনের মতো ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব অনিয়মে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠে এসেছে। যদিও অভিযুক্তরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তথাপি উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার বক্তব্য পরিস্থিতির গভীরতাকেই সামনে এনেছে। একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার মুখে ছয় হাজারের বেশি ভূয়া কার্ড থাকার স্বীকারোক্তি নিঃসন্দেহে ভয়াবহ বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। এমনকি বৈধ কার্ডধারীদের মধ্যেও বড় অংশ প্রকৃত প্রতিবন্ধী নন বলে যে দাবি করা হয়েছে, তা প্রমাণ করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির তদারকি ও যাচাই প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের দুর্বলতা বিদ্যমান। সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, প্রকৃত অসহায় মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। যারা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন, তারা বারবার অফিস ও জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে ঘুরেও প্রকৃত সুবিধা পাচ্ছেন না। অন্যদিকে আর্থিক ও রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে অনেক সুস্থ-সবল ব্যক্তি নিয়মিত সরকারি ভাতা উত্তোলন করছেন। এতে শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ই হচ্ছে না, সামাজিক বৈষম্যও বাড়ছে। এ ধরনের অনিয়ম রোধে কেবল বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ডিজিটাল যাচাইব্যবস্থা শক্তিশালী করা, নিয়মিত অডিট পরিচালনা এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা। তাই এই খাতে দুর্নীতি মানে কেবল অর্থ আত্মসাৎ নয়, বরং অসহায় মানুষের ন্যায্য অধিকার হরণ। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর উচিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যাতে জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীরা তাদের প্রাপ্য অধিকার ফিরে পান।