বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ

পরিবর্তিত সমাজবাস্তবতার সতর্কবার্তা

এফএনএস | প্রকাশ: ১৮ মে, ২০২৬, ০৪:১৩ পিএম
পরিবর্তিত সমাজবাস্তবতার সতর্কবার্তা

বরিশালে আশঙ্কাজনক হারে বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা বৃদ্ধি সামাজিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে যেখানে ৩২ হাজারের বেশি বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে, সেখানে বিচ্ছেদ ঘটেছে প্রায় ১১ হাজার সংসারের। অর্থাৎ প্রতি তিনটি বিয়ের বিপরীতে একটি বিচ্ছেদ ঘটছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, তালাকের আবেদনকারীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। এই পরিসংখ্যান নিছক সংখ্যার হিসাব নয়; এটি পরিবার, সম্পর্ক ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তিত চিত্র তুলে ধরছে। একসময় পরিবারকে সামাজিক স্থিতির মূল ভিত্তি হিসেবে দেখা হলেও বর্তমান বাস্তবতায় দাম্পত্য সম্পর্কে অস্থিরতা ক্রমেই বাড়ছে। এর পেছনে যেমন অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক পরিবর্তন কাজ করছে, তেমনি পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহনশীলতার ঘাটতিও বড় কারণ হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, যৌতুক, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, পরকীয়া এবং অনলাইন জুয়ার মতো সামাজিক ব্যাধি অনেক পরিবারকে ভাঙনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক দ্রুত সম্পর্ক ও তাড়াহুড়ো করে নেওয়া বিয়ের সিদ্ধান্তও দীর্ঘস্থায়ী সংসার গঠনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বাস্তব জীবনের দায়িত্ব, সমঝোতা ও মানসিক প্রস্তুতির অভাবে অনেক সম্পর্ক অল্প সময়েই ভেঙে যাচ্ছে। তবে এই প্রবণতাকে কেবল নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখাও পুরোপুরি সঠিক হবে না। অতীতে অনেক নারী নির্যাতন বা অসম্মানজনক সম্পর্কের মধ্যেও সামাজিক চাপে সংসার টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হতেন। এখন নারীদের সচেতনতা, আর্থিক সক্ষমতা ও আইনি অধিকার সম্পর্কে জানাশোনা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা অন্যায় বা অসহনীয় পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। এটিও সামাজিক পরিবর্তনের একটি বাস্তব দিক। তবুও বিচ্ছেদের ক্রমবর্ধমান হার সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ। কারণ পারিবারিক ভাঙনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সন্তানদের ওপর। মানসিক অস্থিরতা, অনিরাপত্তা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি সামাজিক বন্ধন দুর্বল হলে সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরিবারভিত্তিক সচেতনতা, কাউন্সেলিং ব্যবস্থা এবং মূল্যবোধভিত্তিক সামাজিক শিক্ষা জোরদার করা জরুরি। বিয়েকে শুধু সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং দায়িত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে মাদক, অনলাইন জুয়া ও পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর সামাজিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ প্রয়োজন। সংসার টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব কেবল একজনের নয়; এটি পারস্পরিক আস্থা, সহনশীলতা ও সম্মানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সেই ভিত্তি দুর্বল হলে বিচ্ছেদের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে