জাদুঘর অদ্ভুত বস্তুসমূহের সংগ্রহশালা

প্রকাশ ঘোষ বিধান | প্রকাশ: ১৮ মে, ২০২৬, ০৪:১৪ পিএম
জাদুঘর অদ্ভুত বস্তুসমূহের সংগ্রহশালা
প্রকাশ ঘোষ বিধান

জাদুঘর একটি দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি বহন করে। বাংলায় জাদুঘর কথাটির অর্থ হল, যে গৃহে অদ্ভুত অদ্ভুত পদার্থসমূহের সংগ্রহ আছে এবং যা দেখিয়া আকর্ষণে সম্মোহিত হতে হয়।

জাদুঘর বা সংগ্রহালয় বলতে বোঝায় এমন একটি ভবন বা প্রতিষ্ঠান যেখানে পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহের সংগ্রহ সংরক্ষিত থাকে। জাদুঘরে বিভিন্ন ধরণের বস্তু সংগ্রহ করা হয়, যা মানুষের ইতিহাস, শিল্প, বিজ্ঞান, প্রাকৃতিক পরিবেশ, বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে তুলে ধরে। জাদুঘরের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ঐতিহাসিক বা সাংস্কৃতিক মূল্যবান বস্তুগুলো সংরক্ষণ করা, যাতে ভবিষ্যত প্রজন্মও সেগুলি দেখতে এবং শিখতে পারে। জাদুঘরে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, স্থান, এবং মানুষদের সম্পর্কিত বস্তু রাখা হয়। বিভিন্ন জীববৈচিত্র্য, জীবাশ্ম, প্রাকৃতিক সংগ্রহ এবং ভূতাত্ত্বিক তথ্য সংরক্ষিত থাকে। এখানে দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্ম, ঐতিহ্য, এবং সাধারণ জীবনযাত্রা সম্পর্কিত বস্তু সংরক্ষিত থাকে।

প্রতি বছর ১৮ মে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস পালিত হয়। ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়ামস ১৯৭৭ সাল থেকে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান, ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং যাদুঘরের ভূমিকা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে এই দিবসটি সমন্বয় করে আসছে। জাদুঘর যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অন্যতম মাধ্যম এবং মানুষের ঐতিহ্যের ধারক- তা দিবসটিতে তুলে ধরা।

জাদুঘর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবান বস্তু সংরক্ষণ করে, যা মানুষের ইতিহাস ও সভ্যতার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে কাজ করে। জাদুঘর সম্পর্কে সবারই কমবেশি ধারণা আছে। বিশ্বের শীর্ষ জনপ্রিয় জাদুঘর ল্যুভর মিউজিয়াম: প্যারিসকে বলা হয় অর্ধেক নগরী তুমি অর্ধেক কল্পনা। এই কল্পনার আছে পৃথিবীর সবচেয়ে আশ্চর্য জাদুঘর ল্যুভর। পৃথিবীর বিখ্যাত জাদুঘরগুলোর মধ্যে প্রথমে নাম বলতে গেলে বলতেই হয় ল্যুভরের কথা। মোনালিসা ছবিটা ল্যুভর মিউজিয়ামের বিশেষ একটি ঘরে রাখা হয়েছে। ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব চায়না: জাদুঘরটি চীনের বেইজিংয়ে অবস্থিত। ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়াম: যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত। ১৯০৩ সালে রাইট ভাইদ্বয় যে প্লেন দিয়ে সফলতার সাথে প্রথম ফ্লাইট পরিচালনা করেন, সেটি এখানে রয়েছে। দ্য মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অব আর্ট: যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে অবস্থিত। এখানে ৫ হাজার বছরের পুরনো অনেক আর্ট রয়েছে। ভ্যাটিকান মিউজিয়াম: এই জাদুঘর ভ্যাটিকান সিটিতে অবস্থিত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পোপরা এতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উপাদান সংরক্ষণ করেছে।

বিশ্বের অদ্ভুত কিছু জাদুঘর হলো: ক্রোয়েশিয়া অবস্থিত মিউজিয়াম অব ব্রোকেন রিলেশনশিপ। এখানে ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের স্মৃতিচিহ্ন বা উপহার সংরক্ষণ করা হয়। জাপানে অবস্থিত প্যারাসাইট মিউজিয়াম। এখানে ৬০ হাজারের বেশি পরজীবী প্রাণী ও জীবাণু প্রদর্শিত হয়। যুক্তরাষ্টের বোস্টনে অবস্থিত বাজে শিল্পকলা জাদুঘর। শুধুমাত্র কুরুচিপূর্ণ বা দৃষ্টিকটু ছবি নিয়ে এই জাদুঘরটি তৈরি। যুক্তরাষ্ট্র অবস্থিত পোড়া খাবারের জাদুঘর। ভুল রান্না বা পুড়ে যাওয়া খাবারের অদ্ভুত সংগ্রহশালা। যুক্তরাষ্ট্র উইনচেস্টার মিস্ট্রি হাউসে অবস্থিত : এটি একটি অদ্ভুত স্থাপত্য, যা ভূতের বাড়ি হিসেবেও পরিচিত।

পৃথিবীতে নানা ধরণের জাদুঘর রয়েছে। জাদুঘরগুলি বিভিন্ন দেশের ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য, রীতি-নীতি এবং শিল্পকলা সম্পর্কে ধারণা দেয়, যা সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন তৈরি করতে সাহায্য করে। অনেক জাদুঘর গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রিসোর্স হিসেবে কাজ করে। গবেষকরা এখানে সংরক্ষিত বস্তু বা ডকুমেন্টের মাধ্যমে নতুন তথ্য বের করার চেষ্টা করেন।

জাদুঘরে বৈজ্ঞানিক, শৈল্পিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বস্তুসমূহ সংগ্রহ করে সংরক্ষিত করা হয় এবং সেগুলি প্রদর্শ আধার বা ডিসপ্লে কেসের মধ্যে রেখে স্থায়ী অথবা অস্থায়ীভাবে জনসাধারণের সমক্ষে প্রদর্শন করা হয়। বিশ্বের অধিকাংশ বড় জাদুঘরই প্রধান প্রধান শহরগুলিতে অবস্থিত। অবশ্য ছোটো শহর, মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলেও স্থানীয় জাদুঘর গড়ে উঠতে দেখা যায়।

সারা বিশ্বেই জাদুঘর দেখা যায়। অতীতকালে জাদুঘরগুলি গড়ে উঠত ধনী ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক উদ্যোগে অথবা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে। এই সব জাদুঘরে সংরক্ষিত থাকত শিল্পকর্ম, দুষ্প্রাপ্য ও আশ্চর্যজনক প্রাকৃতিক বস্তু বা পুরাবস্ত।

ইংরেজি মিউজিয়াম শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ থেকে। প্রাচীন গ্রিসে এই জাতীয় মন্দিরগুলিকে কেন্দ্র করে পাঠাগার ও শিল্প পুরাকীর্তির সংগ্রহশালাও গড়ে উঠতে দেখা যেত। ২৮০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে আলেকজান্দ্রিয়ায় টলেমি প্রথম সোটার প্রতিষ্ঠিত দর্শন মিউজিয়াম ছিল। প্রাচীনকালে গড়ে ওঠা আলেকজান্দ্রিয়ার জাদুঘর ছিল আধুনিককালে অন্যতম জাদুঘর।

জাদুঘর হল আমাদের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের একটি খোলা জানালা। জাদুঘর এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে পুরানো এবং মূল্যবান বস্তু সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করা হয়, যাতে মানুষ সেগুলি দেখে, বুঝে এবং শিখতে পারে। এটি আমাদের অতীতের ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিল্প এবং বৈজ্ঞানিক অর্জন সম্পর্কে ধারণা প্রদান করে এবং বিশ্ব সম্পর্কে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করে। তাই সুযোগ পেলে অবশ্যই জাদুঘর ঘুরে দেখা উচিত।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে