নতুন সরকারের প্রথম বাজেট ঘিরে জনমনে প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই বেশি। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনগণ এমন একটি বাজেট দেখতে চায়, যা একদিকে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে থাকা মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সরকারকে এবার এমন এক সময়ে বাজেট প্রণয়ন করতে হচ্ছে, যখন অর্থনীতি বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে। প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ হতে যাচ্ছে। উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ভর্তুকি, বেতন কাঠামো এবং বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের চাপ মিলিয়ে ব্যয়ের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে। অথচ রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়। চলতি অর্থবছরের নয় মাসেই প্রায় এক লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে প্রায় সাত লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যকে অনেক অর্থনীতিবিদ উচ্চাভিলাষী বলেই মনে করছেন। সরকার সীমিত আয়ের মানুষের স্বস্তির জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করছাড়ের চিন্তা করছে, যা ইতিবাচক উদ্যোগ। একই সঙ্গে বিলাসপণ্যে বাড়তি কর আরোপের পরিকল্পনাও সামাজিক ভারসাম্যের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে করের আওতা গ্রাম পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সতর্কতা প্রয়োজন, যাতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না হয়। অন্যদিকে ভর্তুকি ও প্রণোদনায় এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ, সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং নতুন বেতন কাঠামোর চাপ সরকারের ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে ঋণের সুদ পরিশোধেই বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ। এডিপির আকার তিন লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি আনতে সহায়ক হতে পারে। তবে থোক ও বিশেষ বরাদ্দের উচ্চহার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। উন্নয়ন বাজেটের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত না হলে বড় বরাদ্দের সুফল জনগণ পাবে না। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন বড় বাজেট মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক অস্থিতিশীলতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই শুধু বড় আকারের বাজেট নয়, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত ও দক্ষ ব্যয় ব্যবস্থাপনা। রাজস্ব আহরণে সংস্কার, কর ফাঁকি রোধ, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এখন সময়ের দাবি। নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনগণের প্রত্যাশা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। জনপ্রিয়তার জন্য নয়, টেকসই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার লক্ষ্যেই বাজেট প্রণয়ন হওয়া জরুরি।