দেশের অর্থনীতিতে চা-শিল্পের অবদান দীর্ঘদিনের। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে চা-বাগানকেন্দ্রিক শ্রম ও উৎপাদনের মাধ্যমে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী জীবনধারণ করে আসছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এই জনগোষ্ঠীর সন্তানদের মৌলিক অধিকার-শিক্ষা-এখনও নিশ্চিত হয়নি। মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার ২৬টি চা-বাগানের মধ্যে ২১টিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকা সেই বঞ্চনারই করুণ প্রতিচ্ছবি। শিক্ষা একটি রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক অধিকার। অথচ চা-বাগান এলাকার শত শত শিশু এখনও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। কোথাও বিদ্যালয়ই নেই, আবার কোথাও নামমাত্র কিছু বেসরকারি স্কুল থাকলেও সেগুলোর অবকাঠামো ও শিক্ষার মান অত্যন্ত দুর্বল। এক কক্ষবিশিষ্ট জরাজীর্ণ স্কুলে শিক্ষার পরিবেশ গড়ে ওঠা কঠিন। ফলে শিশুদের বড় একটি অংশ প্রাথমিক শিক্ষার আগেই ঝরে পড়ছে। এটি শুধু একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়; বরং সামাজিক বৈষম্য ও উন্নয়ন বৈপরীত্যের বড় উদাহরণ। চা-শ্রমিক সম্প্রদায় ঐতিহাসিকভাবেই নানা বঞ্চনার শিকার। নিম্ন মজুরি, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং আবাসন সংকটের পাশাপাশি শিক্ষাবঞ্চনাও তাদের প্রজন্মগত দারিদ্র্যকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। শিক্ষার সুযোগ সীমিত থাকায় নতুন প্রজন্ম দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে না, যা তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। সরকারি বিদ্যালয় স্থাপনে ভূমি জটিলতা ও বাগান কর্তৃপক্ষের অনীহার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ১৭২ বছর পরও কেন এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হলো না? রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল শহর বা সুবিধাপ্রাপ্ত অঞ্চলে শিক্ষা সম্প্রসারণ নয়; বরং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছেও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। চা-বাগান এলাকার শিশুরা কোনোভাবেই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হতে পারে না। ইতিবাচক দিক হলো, নতুন করে ছয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে শুধু প্রস্তাব পাঠানোই যথেষ্ট নয়; দ্রুত বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে জরুরি। পাশাপাশি বিদ্যমান স্কুলগুলোর মানোন্নয়ন, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে বিশেষ সহায়তা কর্মসূচিও প্রয়োজন। চা-শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষাবঞ্চনা কেবল মানবিক সমস্যা নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গেও সম্পর্কিত। একটি বড় জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা থেকে দূরে রেখে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই চা-বাগান এলাকায় শিক্ষার বিস্তারকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে। রাষ্ট্র, বাগান কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগেই এ সংকটের সমাধান সম্ভব। অন্যথায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই বঞ্চনার চক্রে আবদ্ধ থাকবে।