কাগজে-কলমে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত পৌরসভা হলেও মুন্সীগঞ্জ পৌরবাসীর বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা, আধুনিক নাগরিক সেবা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের যে প্রত্যাশা একটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভাকে ঘিরে থাকে, মুন্সীগঞ্জে তার বড় অংশই অনুপস্থিত। বরং দিন যত যাচ্ছে, নাগরিক দুর্ভোগ ততই প্রকট হচ্ছে। শহরের প্রধান সড়কগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী যানজট এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আদালত, প্রশাসনিক কার্যালয় ও বিভিন্ন সেবাকেন্দ্রে যাতায়াতের জন্য জেলার ছয়টি উপজেলা থেকে আসা মানুষের চাপ সামাল দেওয়ার মতো সক্ষমতা বিদ্যমান সড়কব্যবস্থার নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনিয়ন্ত্রিত অটোবাইক চলাচল ও সড়কের দুই পাশে অবৈধ দখল। ফলে একটি ছোট জেলা শহর কার্যত স্থবির নগরজীবনের দিকে এগোচ্ছে। অন্যদিকে ভাঙাচোরা ও অপ্রশস্ত সড়ক নাগরিক দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে, ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত। অথচ নগর অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ একটি পৌরসভার মৌলিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সংকট। খাল, জলাশয় ও নিচু ভূমি ভরাটের ফলে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। তার ওপর নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার না হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের বড় অংশ পানির নিচে চলে যাচ্ছে। একসময়কার গুরুত্বপূর্ণ খালগুলো দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ার বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, নগর পরিকল্পনার দীর্ঘমেয়াদি অবহেলারও প্রতীক। ময়লা-আবর্জনা ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে চরম অদক্ষতা। সব ওয়ার্ডে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে না ওঠায় আবর্জনা খাল-বিল ও জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের ঘাটতি নগরবাসীর জীবনমানকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এমন পরিস্থিতিতে নাগরিক সেবার উন্নতি ছাড়াই পৌরকর কয়েকগুণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই জনঅসন্তোষ তৈরি করেছে। জনগণ যখন মৌলিক সুবিধা থেকেই বঞ্চিত, তখন অতিরিক্ত কর আরোপকে তারা অযৌক্তিক বলেই মনে করছেন। সেবার মান ও করব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে নাগরিক আস্থা তৈরি হয় না। পৌর কর্তৃপক্ষ জনবল সংকট ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতির কথা বলছে। বাস্তবতা হলো, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। প্রয়োজন সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন। মুন্সীগঞ্জ পৌরসভাকে সত্যিকার অর্থে আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরে পরিণত করতে হলে এখনই কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নয়তো নাগরিক দুর্ভোগ ও জনঅসন্তোষ আরও বাড়বে।