জামানতহীন ঋণ ও ব্যাংক খাতের আস্থাসংকট

এফএনএস | প্রকাশ: ২১ মে, ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএম
জামানতহীন ঋণ ও ব্যাংক খাতের আস্থাসংকট

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল তদারকি ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্যের যে ভয়াবহ চিত্র বারবার উঠে এসেছে, একীভূত হওয়া পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি তারই নগ্ন উদাহরণ। জামানতবিহীন ঋণ বিতরণ, অতিমূল্যায়িত সম্পদ দেখিয়ে ঋণ অনুমোদন এবং রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবের মাধ্যমে ব্যাংক দখলের সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়, সাধারণ আমানতকারীদের জীবন-জীবিকাকেও বিপন্ন করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশের বিপরীতে কার্যকর জামানত নেই। আরও উদ্বেগজনক হলো, প্রায় ১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা মোট ঋণের প্রায় ৮৭ শতাংশ। এ ধরনের পরিস্থিতি কোনো স্বাভাবিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কল্পনাতীত। বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে এস আলম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ভূমিকা। পত্রপত্রিকায় উঠেছে এসেছে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও ব্যাংক পরিচালনায় প্রভাব খাটিয়ে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়েছে, যার অধিকাংশই ছিল জামানতবিহীন। একই সঙ্গে ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সহযোগিতা ছাড়া এমন অনিয়ম সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থাৎ এটি শুধু করপোরেট দুর্নীতি নয়; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। পরিস্থিতি এতটাই জটিল আকার ধারণ করে যে সরকারকে শেষ পর্যন্ত পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করতে হয়েছে। আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে বিপুল পরিমাণ অর্থ সহায়তা দিতে হয়েছে। আমানত বিমা তহবিল থেকে ইতোমধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকও কার্যক্রম সচল রাখতে বড় অঙ্কের তারল্য সহায়তা দিয়েছে। অর্থাৎ বেসরকারি অনিয়মের দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও জনগণকেই বহন করতে হচ্ছে। তবে শুধু একীভূতকরণই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান নয়। সবচেয়ে জরুরি হলো দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা। যারা নিয়ম ভেঙে ঋণ নিয়েছেন, যারা অনুমোদন দিয়েছেন এবং যারা তদারকিতে ব্যর্থ হয়েছেন-সবার বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট আরও গভীর হবে। একই সঙ্গে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে একীভূত ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে। সাম্প্রতিক আইন সংশোধনের মাধ্যমে আগের মালিকদের ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় আমানতকারীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এই অনিশ্চয়তা দ্রুত দূর করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য একটি সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা অপরিহার্য। তাই এই সংকটকে শুধু একটি ব্যাংক কেলেঙ্কারি হিসেবে নয়, বরং আর্থিক খাত সংস্কারের শেষ সতর্কবার্তা হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে