লবণচাষে লোকসান, লাভে সিন্ডিকেট

এফএনএস | প্রকাশ: ২২ মে, ২০২৬, ০৪:১৪ পিএম
লবণচাষে লোকসান, লাভে সিন্ডিকেট

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর লবণচাষিদের বর্তমান সংকট দেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির একটি পুরোনো কিন্তু গভীর সমস্যাকেই আবার সামনে এনেছে-প্রকৃত উৎপাদক ন্যায্যমূল্য পান না, অথচ মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজার নিয়ন্ত্রক চক্র বিপুল মুনাফা করে। চলতি মৌসুমে ভালো উৎপাদন হলেও লবণচাষিদের মুখে হাসি নেই; বরং উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কম দামে লবণ বিক্রি করতে গিয়ে তারা চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন। দৈনিক খবরাখবর থেকে জানা গেছে, প্রতি মণ লবণ উৎপাদনে খরচ পড়ছে প্রায় ৩৫০ টাকা, অথচ বাজারে চাষিরা পাচ্ছেন মাত্র ২৪০ থেকে ২৫০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মণেই প্রায় ১১০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে অনেক চাষি ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে টিকে থাকার সংগ্রাম করছেন। বিশেষত যারা উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে উৎপাদনে নেমেছেন, তাদের জন্য এই ক্ষতি আরও ভয়াবহ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সংকটের পেছনে চাষিরা সরাসরি সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দায়ী করছেন। অভিযোগ রয়েছে, কার্গো বোটের মালিক ও ব্যবসায়ী চক্র মিলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। যেহেতু উৎপাদিত লবণ সমুদ্রপথে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠাতে হয়, তাই পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল চাষিরা কার্যত এই গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি না হয়ে একধরনের নিয়ন্ত্রিত মূল্যব্যবস্থা চালু হয়েছে, যেখানে ক্ষতির ভার বহন করছেন কেবল উৎপাদকরা। অন্যদিকে খুচরা বাজারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্যাকেটজাত লবণ প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হলেও মাঠপর্যায়ে কৃষক পাচ্ছেন মাত্র ৫ থেকে ৬ টাকা। উৎপাদক ও ভোক্তা পর্যায়ের এই বিশাল মূল্য ব্যবধান স্পষ্ট করে যে সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে অস্বাভাবিক মুনাফা হচ্ছে। অথচ সেই লাভের সামান্য অংশও প্রকৃত চাষিদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। এ বাস্তবতায় লবণচাষিদের দাবিগুলো অযৌক্তিক নয়। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, সহজ শর্তে ঋণ ও উৎপাদন উপকরণে ভর্তুকি-এসব এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে উপকূলীয় লবণশিল্প রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা গ্রহণ জরুরি। কারণ এই শিল্প শুধু হাজারো মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত নয়, দেশের খাদ্য ও শিল্পখাতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সরকার যদি কৃষকবান্ধব অর্থনীতির কথা বলে, তবে লবণচাষিদের এই সংকটকে গুরুত্ব দিয়েই দেখতে হবে। উৎপাদন বাড়লেও যদি কৃষক লোকসানে ডুবে যান, তবে ভবিষ্যতে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন। এতে একসময় দেশীয় লবণশিল্পই হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই এখন প্রয়োজন বাজার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা, অসাধু সিন্ডিকেট ভাঙা এবং প্রকৃত উৎপাদকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা। তাহলেই লবণচাষে টিকে থাকবে মানুষের স্বপ্ন ও উপকূলীয় অর্থনীতির প্রাণশক্তি।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে