দীর্ঘ বিরতির পর আবারও বিশ্বসংগীতের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় ব্যান্ড BTS। সামরিক দায়িত্ব শেষে সাত সদস্য একত্র হয়ে প্রকাশ করেছে নতুন অ্যালবাম ‘আরিরাং’। আর ফিরেই যেন পুরোনো জাদুতে মুগ্ধ করেছে ভক্তদের। মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই শুধু যুক্তরাষ্ট্রে অ্যালবামটির ৬ লাখ ৪১ হাজার কপি বিক্রি হয়েছে। পাশাপাশি ১১৫টি দেশের অ্যাপল মিউজিক চার্টের শীর্ষেও উঠে এসেছে এটি।
বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ওঠার পর বিটিএসকে ঘিরে একসময় প্রশ্ন উঠেছিল, তারা কি নিজেদের শিকড় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে? বিশেষ করে ‘ডায়নামাইট’, ‘বাটার’ ও ‘পারমিশন টু ড্যান্স’-এর মতো ইংরেজি গানের ব্যাপক সাফল্যের পর সেই আলোচনা আরও জোরালো হয়। তবে নতুন অ্যালবাম ‘আরিরাং’-এ দলটি আবার ফিরেছে নিজেদের পুরোনো হিপহপ ও র্যাপনির্ভর ধারায়, যদিও এবার তা আরও পরিণত ও অভিজ্ঞতার ছোঁয়ায় ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।
অ্যালবামটির নাম নেওয়া হয়েছে একটি প্রাচীন কোরীয় লোকগান থেকে। যদিও সদস্যরা বলছেন, তাঁরা জোর করে ‘কোরিয়ানত্ব’ তুলে ধরতে চাননি। তবু কোরীয় ভাষার ব্যবহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ছিল সচেতন। তাঁদের মতে, বিশ্বমঞ্চে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির জায়গা আরও শক্ত করতেই এই পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘ ১৮ মাসের সামরিক জীবন RM–এর ব্যক্তিগত জীবনেও বড় প্রভাব ফেলেছে। অনিদ্রা, মানসিক চাপ আর নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্নের ভেতর দিয়েই কেটেছে তাঁর সময়। তিনি বলেন, “আমি এখনো বেশ বিভ্রান্ত। সেনাবাহিনী থেকে ফেরার পর বুঝেছি, বিটিএসকে নিয়ে আমাদের ভেতরে এখনো অনেক প্রশ্ন আছে। তবে এই ১৪টি গানের মধ্যেই হয়তো সেই উত্তরগুলো পাওয়া যাবে।”
একই ধরনের দ্বন্দ্ব ছিল J-Hope–এর মনেও। বিশ্বজুড়ে অগণিত মানুষের ভালোবাসা আর জনপ্রিয়তা তাঁকে অনেক সময় ভয় পাইয়ে দিত। তাঁর ভাষায়, “মনে হতো, সবাই যখন আমাকে হাততালি দিচ্ছে, তখনই হয়তো সব থামিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি আগুনটা আরও উজ্জ্বলভাবে জ্বালানোর পথটাই বেছে নিয়েছি।”
অন্যদিকে Suga মনে করেন, বিটিএসের পুনর্মিলন নিয়ে কখনোই কোনো সন্দেহ ছিল না। তিনি বলেন, “আমরা আলাদা কাজ করেছি কারণ তখন দল হিসেবে কাজ করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু আমি সবসময়ই জানতাম, আমরা আবার এক হব।”
নতুন অ্যালবামের পরিকল্পনা নিয়েও বেশ স্পষ্ট ছিলেন আরএম। তাঁর মতে, নিজেদের চ্যালেঞ্জ না করতে পারলে দল চালিয়ে যাওয়ার কোনো অর্থ নেই। তিনি বলেন, “পৃথিবীকে দেখাতে হবে আমরা এখনো নতুন কিছু খুঁজছি। শেষ সীমায় পৌঁছানো আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়।”
বয়সে সবচেয়ে বড় সদস্য Jin সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন সবার আগে। সামরিক দায়িত্ব শেষে তিনি অলিম্পিক গেমস প্যারিস ২০২৪-এ মশাল বহন করেন এবং একক সংগীত নিয়েও কাজ করেন। তবু তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল দল। জিন বলেন, “যদি দল না থাকে, তাহলে এগিয়ে যাওয়ার কোনো মানে হয় না।”
সবচেয়ে কম বয়সী সদস্য Jungkook এখনো নিজেকে পুরোপুরি পপস্টার ভাবতে পারেন না। অথচ তাঁর একক গান ‘সেভেন’ ২০২৩ সালে স্পটিফাইয়ের সবচেয়ে বেশি স্ট্রিম হওয়া গানগুলোর একটি ছিল। বিনয়ী কণ্ঠে তিনি বলেন, “মানুষ আমাকে স্টার ভাবে, এটাই আমার কাছে বড় ব্যাপার। তাই আমি আরও ভালো করতে চাই।”
Jimin–এর ভাষায়, বিটিএস এখন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, “আমি একজন ব্যক্তি হিসেবেও আরও ভালো গায়ক হতে চাই। কারণ আমার টিমমেটরা এতটাই অসাধারণ যে তাঁদের পাশে টিকে থাকতে হলে আমাকে আরও উন্নতি করতে হবে।”
নিজের একক অ্যালবাম ‘লেওভার’ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে V বলেন, “এই অ্যালবাম না এলে হয়তো মানুষ আমাকে শুধু একজন নৃত্যশিল্পী বা গায়ক হিসেবেই চিনত। আমার ভেতরের নানা রং প্রকাশ পেত না।”
নতুন অ্যালবামের গান তৈরির সময় প্রায় দুই মাস একসঙ্গে লস অ্যাঞ্জেলেসে ছিলেন সদস্যরা। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টুডিওতে কাজ করেছেন তাঁরা। আন্তর্জাতিক প্রযোজক ও শিল্পীদের সঙ্গেও হয়েছে সহযোগিতা। তবে পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রত্যেক সদস্যের আলাদা স্বর ও ব্যক্তিত্বকে।
বিটিএসের শুরুটা ছিল র্যাপভিত্তিক আগ্রাসী হিপহপ ধাঁচে। সময়ের সঙ্গে তাঁদের সংগীত বদলেছে, বিশ্বসংগীতের মূলধারায়ও জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু ‘আরিরাং’-এ তাঁরা যেন আবার ফিরে গেছেন সেই শুরুর শক্তি আর ক্ষুধায়। আরএম বলেন, “২০১৩ সালে যেভাবে বিশ্বকে কিছু দেখানোর তীব্র ইচ্ছা ছিল, সেই অনুভূতিটা আবার ফিরে এসেছে।”
দীর্ঘ বিরতি, সামরিক জীবন, একক ক্যারিয়ার, মানসিক চাপ, বিশ্বখ্যাতির বোঝা, সবকিছু পেরিয়ে বিটিএস এখন যেন নতুন এক অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে। যেখানে প্রতিযোগিতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সংগীতকে উপভোগ করা।
সুগার কথায়, “আগে আমরা শুধু লক্ষ্য অর্জনের পেছনে ছুটতাম। এখন মনে হয়, একটু শান্ত হয়ে কাজটা উপভোগ করাও দরকার।”