প্রতিনিয়ত বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উপকূলীয় জেলাগুলোতে ঢ়ুকছে লবণাক্ত পানি। নষ্ট হচ্ছে মাটির উর্বরতা, সুপেয় পানির তীব্র সংকটে বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষের জীবন। উপর্যুপরি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসে একের পর এক ভেঙে যাচ্ছে বেড়িবাঁধ। জলবায়ু পরিবর্তনের এমন ভয়াল বাস্তবতায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের মানুষ এখন অস্তিত্বের সংকটে ভুগছেন। এই পরিস্থিতি থেকে উপকূলকে বাঁচাতে আগামী জাতীয় বাজেটে সুনির্দিষ্ট ও বিশেষ বরাদ্দের জোর দাবি উঠেছে।
শনিবার (২৩ মে) সকাল ১১টায় সাতক্ষীরা শহরের পানসী রেস্টুরেন্টে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশবাদীরা এই দাবি জানান। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম’-এর সাতক্ষীরা জেলা শাখা এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘লোকাল এনভায়রনমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল রিসার্চ সোসাইটি’ (লিডার্স) এই ফোরামের সচিবালয় হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে।
সংবাদ সম্মেলনে সাতক্ষীরা সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর আব্দুল হামিদের সভাপতিত্বে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মাধব চন্দ্র দত্ত। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দেশ টিভির স্টাফ রিপোর্টার সাংবাদিক শরীফুল্লাহ কায়সার সুমন।
সংবাদ সম্মেলনে বৈশ্বিক বিভিন্ন গবেষণা ও সূচক উল্লেখ করে জানানো হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক অভিঘাতে বাংলাদেশ এখন খাদের কিনারায়। লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘ম্যাপলক্রাফট’-এর জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বের ১৭০টি দেশের মধ্যে জলবায়ু সংকটে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ১৬টি দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ।
একইভাবে, ‘ওয়ার্ল্ড রিস্ক ইনডেক্স ২০২৩’ অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী ঝুঁকির দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। জার্মানওয়াচ-এর ‘জলবায়ু ঝুঁকি সূচক ২০২৫’ বলছে, দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা দেশের তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে ১৩তম অবস্থানে।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূখণ্ড সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার ফলে দেশের ৩০ শতাংশ কৃষিজমি হারিয়ে যাবে। এর চেয়েও বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে শতকের শেষে। ২১০০ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলসহ দেশের প্রায় ৪৩৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। এর ফলে প্রায় ১০ মিলিয়ন (১ কোটি) মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি হারিয়ে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবেন।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, বিগত ২০ বছরে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে একের পর এক শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। এতে যেমন প্রাণহানি ঘটেছে, তেমনি অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়েছে উপকূলের মানুষ।
২০০৭ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ১১,৫৬০ কোটি টাকা। এর মাত্র দুই বছর পর ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলা খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে ব্যাপক তণ্ডব চালিয়ে ১,৮৮৫ কোটি টাকার ক্ষতি করে, যা এই অঞ্চলের মানুষকে দীর্ঘ সময় লোনা পানির মধ্যে আটকে রাখে। এরপর ২০১৯ সালে পরপর দুটি দুর্যোগ ফণী ও বুলবুলের কারণে যথাক্রমে ৫৩৬ কোটি ও ২৬৩ কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। ২০২০ সালে করোনা মহামারির চরম সংকটের মধ্যে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আম্পান। খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী ও সাতক্ষীরাসহ ১৭টি জেলায় এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১,১০০ কোটি টাকা।
ক্ষয়ক্ষতির এই ধারা এখানেই থেমে থাকেনি। ২০২১ সালে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস ৩০০ কোটি টাকা, ২০২২ সালে সিত্রাং ৪১৪ কোটি টাকা এবং ২০২৩ সালে মিধিলি প্রায় ২০০ কোটি টাকার ক্ষতিসাধন করে। আর সর্বশেষ ২০২৪ সালের মে মাসে পশ্চিম উপকূলে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় রেমাল ৬,৮৮০ কোটি টাকার বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি রেখে যায়, যার ক্ষত উপকূলবাসী এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন।
পরিবেশকর্মীরা জানান, এই বিপুল আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের মৃত্যু, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি, বসতভিটা ধ্বংস এবং তীব্র মানসিক চাপের মতো বিশাল ‘অ-অর্থনৈতিক ক্ষতি’ উপকূলবাসীকে প্রতিদিন সইতে হচ্ছে। কর্মসংস্থান হারিয়ে গ্রাম ছেড়ে মানুষ শহরমুখী হওয়ায় গ্রাম থেকে শহরমুখী অভিবাসন এখন একটি বড় মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
উপকূলের মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষার প্রধান ঢাল হলো বেড়িবাঁধ। কিন্তু বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (ইডউই) তথ্য ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, উপকূলীয় এলাকায় বর্তমানে প্রায় ২৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ চরম ঝুঁকিপূর্ণ বা অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
বক্তারা অভিযোগ করেন, ভাঙনপ্রবণ ও ঘাটতিযুক্ত এই বাঁধগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব রয়েছে। সিডর, আইলা ও রেমালের মতো বড় বড় ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কায় বাঁধগুলো ক্রমান্বয়ে আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে সামান্য জোয়ারের পানিতেই বাঁধ ভেঙে বিস্তূর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে, যা উপকূলীয় অঞ্চলের সামগ্রিক সুরক্ষাবলয়কে পুরোপুরি ভেঙে ফেলেছে। এর ফলে লোনা পানি ঢ়ুকে নষ্ট হচ্ছে সুপেয় পানির উৎস, ছড়াচ্ছে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন জলবাহিত রোগ। পুষ্টিহীনতার শিকার হচ্ছে নারী ও শিশুরা।
উপকূলীয় এলাকার সংকটের বিপরীতে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দের চিত্রটি চরম হতাশাজনক বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়। গত ১০ বছরের বাজেট বরাদ্দ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দেশের মোট জাতীয় বাজেট ক্রমান্বয়ে বাড়লেও শতকরা হারের দিক থেকে জলবায়ু ও পরিবেশ খাতের বরাদ্দ প্রতি বছর কমছে। যেমন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যেখানে মোট বাজেট ছিল ৩.৪১ লাখ কোটি টাকা, সেখানে জলবায়ু খাতের বরাদ্দ ছিল ২৮,০০০ কোটি টাকা-যা ছিল মোট বাজেটের ৮.২১ শতাংশ। এর পরের বছরগুলোতে বাজেট বাড়লেও জলবায়ুর হিস্যা কমতে থাকে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪ লাখ কোটি টাকার বাজেটে জলবায়ু খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৩০,০০০ কোটি টাকা (৭.৫০%), ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪.৬৪ লাখ কোটি টাকার বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৩৩,০০০ কোটি টাকা (৭.১০%) এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫.২৩ লাখ কোটি টাকার বাজেটে এই খাতের বরাদ্দ ছিল ৩৫,০০০ কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসাবে দাঁড়ায় ৬.৬৯%।
পরবর্তী বছরগুলোতেও এই পতনের ধারা অব্যাহত ছিল। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫.৬৮ লাখ কোটি টাকার বাজেটে জলবায়ু খাতের বরাদ্দ ছিল ৩৭,০০০ কোটি টাকা বা ৬.৫১ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬.০৪ লাখ কোটি টাকার বাজেটে ৩৮,০০০ কোটি টাকা (৬.২৯%) এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬.৭৮ লাখ কোটি টাকার বাজেটে ৩৯,০০০ কোটি টাকা (৫.৭৫%) বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এসে এই বরাদ্দ আরও কমে দাঁড়ায় মোট বাজেটের মাত্র ৪.৮৬ শতাংশে, যেখানে ৭.৬২ লাখ কোটি টাকার বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৩৭,০৫২ কোটি টাকা।
সর্বশেষ দুই অর্থবছরে বরাদ্দের পরিমাণ সামান্য বাড়লেও তা আগের দশকের শুরুর দিকের তুলনায় অনেক কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭.৯৭ লাখ কোটি টাকার বাজেটে ৪১,২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা মোট বাজেটের ৫.১৭ শতাংশ। আর আসন্ন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত ৭.৯০ লাখ কোটি টাকার বাজেটে জলবায়ু খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪১,২০৯ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের মাত্র ৫.২১ শতাংশ।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও পরিবেশবাদীদের মতে, জলবায়ু খাতের এই বরাদ্দ শুধু অপর্যাপ্তই নয়, বরং এটি সঠিক পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়নি। তাছাড়া, এই বরাদ্দের বড় অংশই খরচ হয় কৃষি, পানি সম্পদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজের মাধ্যমে। ফলে সরাসরি পরিবেশের স্থায়ী সুরক্ষা এবং উপকূলের অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আলাদা কোনো বিশেষ বা সুনির্দিষ্ট বাজেট এখনো অত্যন্ত সীমিত।
সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের সুরক্ষার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, সুন্দরবন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের জন্য শুধু একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই নয়, এটি এক প্রাকৃতিক প্রাচীর। যুগে যুগে সব বড় ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস নিজের বুকে পেতে নিয়ে দেশকে রক্ষা করে আসছে সুন্দরবন।
জাতীয় অর্থনীতিতেও এই বনের অবদান অপরিসীম। সুন্দরবনের মাছ, মধু, কাঠ ও বনজ সম্পদ থেকে প্রতি বছর দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক মূল্য যুক্ত হচ্ছে। এছাড়া, উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৩৫ থেকে ৫০ লাখ (৩.৫-৫ মিলিয়ন) মানুষ प्रत्यक्ष ও পরোক্ষভাবে তাদের জীবিকার জন্য এই সুন্দরবনের ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। সুন্দরবনের পরিবেশ বিপন্ন হলে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপকূলের সুরক্ষায় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার তাগিদ দেওয়া হয়। মাঠপর্যায় থেকে নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং স্থানীয় জনগণের অভিজ্ঞতা ও চাহিদাকে আসন্ন জাতীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল কাশেম, সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম কামরুজ্জামান, প্রবীণ সাংবাদিক জিএম মনিরুল ইসলাম মিনি, আমিনা বিলকিস ময়না, এসএম শহীদুল ইসলাম, শেখ তানজির আহমেদ, আকরামুল ইসলাম, আসাদুজ্জামান সরদার, মো. হোসেন আলী, মিলন বিশ্বাস, শেখ সিদ্দিকুর রহমান এবং ভূমিহীন নেতা আব্দুস সামাদসহ সুশীল সমাজ, পরিবেশকর্মী ও যুবসমাজের প্রতিনিধিরা।
উপকূলের এই মানবিক ও পরিবেশগত সংকট নিরসনে আসন্ন জাতীয় বাজেটে একটি ‘বিশেষ উপকূলীয় তহবিল’ হিসেবে কার্যকর বরাদ্দ দেওয়া হবে-এমনটাই প্রত্যাশা সাতক্ষীরাসহ দেশের সমগ্র উপকূলবাসীর।