রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান

এফএনএস (বলরাম দাশ অনুপম; কক্সবাজার) :
| আপডেট: ১০ জুন, ২০২৬, ০৫:০১ পিএম | প্রকাশ: ১০ জুন, ২০২৬, ০৫:০১ পিএম
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান

রোহিঙ্গা সংকট এখন নবম বছরে পদার্পণ করেছে। ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও এবং জাতিসংঘের সংস্থাগুলো কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ মানবিক সহায়তা প্রদান করে আসছে। এ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য প্রতি বছর একটি যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনা  প্রণয়ন করা হয়। তবে স্থানীয় অংশীজনরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, জেআরপি ২০২৬-এর বাস্তবায়ন কাঠামো থেকে স্থানীয় এনজিওগুলোকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বুধবার (১০ জুন) সকালে কক্সবাজার প্রেসক্লাবে কক্সবাজার সিএসও এনজিও ফোরাম (সিসিএনএফ) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, জেআরপি বাস্তবায়ন থেকে স্থানীয় এনজিওদের বাদ দেওয়া গ্র্যান্ড বার্গেইনের অধীনে গৃহীত স্থানীয়করণ অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যার স্বাক্ষরকারী ইউএনএইচসিআর। “ইউএনএইচসিআরকে অবশ্যই স্থানীয় এনজিওদের অংশীদারিত্বে অগ্রাধিকার দিতে হবে; জেআরপিতে স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর জন্য ৫% বরাদ্দ স্থানীয়করণ অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়”শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গা মানবিক কার্যক্রমে স্থানীয় অংশীজনদের অধিকতর অন্তর্ভুক্তি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় তাদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

বক্তারা জেআরপি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় এনজিও প্রতিনিধিদের জন্য সুযোগ না রাখারও সমালোচনা করেন। তারা উল্লেখ করেন যে, জেআরপি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় এনজিও প্রতিনিধির বক্তব্যের প্রস্তাবনা গ্রহণ করা হয়নি, অথচ আন্তর্জাতিক এনজিওর মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, বৈশ্বিক স্থানীয়করণ প্রতিশ্রুতির আলোকে জেআরপিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে এবং আন্তর্জাতিক এনজিও ও জাতিসংঘ সংস্থার পাশাপাশি স্থানীয় ও জাতীয় সংগঠনগুলোর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া বক্তারা একটি “জেআরপি ২.০”কাঠামোর প্রস্তাব করেন, যেখানে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সিসিএনএফ-এর প্রধান মডারেটর  রেজাউল করিম চৌধুরী অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন স্থানীয় এনজিও প্রতিশ্রুতির আঞ্জুমান আরা, কোস্ট ফাউন্ডেশনের মো. ইকবাল উদ্দিন, মো. শাহিনুর ইসলাম ও তাহরিমা আফরোজ টুম্পা; কক্সবাজার পর্যটন শিল্প, সমবায় সমিতি লিমিটেডের নেওয়াজ মো. সেলিম, রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের নুরুল কবির; পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক প্যানেল চেয়ারম্যান মোজাফ্ফর আহমদ; কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমির নুরুল ইসলাম; কক্সবাজার ইয়ুথ ফোরামের নাসিমা আখতার; কক্সবাজার উইমেন চেম্বার অব কমার্সের জাহানারা ইসলাম এবং কক্সবাজার প্রেসক্লাবের মমতাজ উদ্দিন বাহারী। এছাড়াও সিসিএনএফ-এর সদস্যবৃন্দ এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

রেজাউল করিম চৌধুরী রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে সরকার ও জাতিসংঘ সংস্থাগুলোকে নাফ নদীর পানি পরিশোধন করে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়ারও আহ্বান জানান। আঞ্জুমান আরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পূর্ববর্তী বছরগুলোর মতো এবার জেআরপি ২০২৬ স্থানীয় এনজিওদের সাথে শেয়ার করা হয়নি। তিনি জেআরপি বাস্তবায়নে স্থানীয় এনজিও ও স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তির আহ্বান জানান। 

মোঃ ইকবাল উদ্দিন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপভিত্তিক “জেআরপি ২.০”প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মোঃ শাহিনুর ইসলাম বলেন যে, টঘঙঈঐঅ রোহিঙ্গা সংকটে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ করেছে। যার ৯২ শতাংশ পেয়েছে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো এবং ৮ শতাংশ পেয়েছে আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো। এটি তাদের স্থানীয়করণ অঙ্গীকারের পরিপন্থী। তিনি বলেন, আগামী তহবিল বরাদ্দে স্থানীয় সংগঠনগুলোকে জেআরপির আবেদনকারী সংস্থা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাদের সরাসরি তহবিল প্রদানের সুযোগ প্রদান করতে হবে। তাহারিমা আফরোজ তুম্পা জেআরপি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় অংশীজনদের পক্ষে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের বক্তব্য দেওয়ার প্রথা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

নুরুল কবির বলেন, জেআরপি ২০২৬-এ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য মাত্র ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তিনি সরকারি নির্দেশনার আলোকে এই বরাদ্দ ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার দাবি জানান।  মোজাফ্ফর আহমদ কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের অব্যাহত আগমন এবং এর ফলে স্থানীয় জনগণের জীবীকা ও অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরেন। নুরুল ইসলাম জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর ব্যয়ের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। নাসিমা আখতার বলেন, একটি স্থানীয় এনজিও ৩০টিরও বেশি প্রকল্প পেয়েছে, অথচ অনেক স্থানীয় সংগঠন কোনো প্রকল্পই পায়নি। এই একচেটিয়া ও কেন্দ্রীভূত অর্থায়ন ব্যবস্থা বন্ধ করতে হবে। তিনি সকল স্থানীয় এনজিওর জন্য ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে