দেশে চায়ের উৎপাদন বাড়লেও রপ্তানিতে পিছিয়ে পড়ছে। বিগত দুই দশক আগেও রপ্তানি হতো দেশে উৎপাদিত চায়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। বর্তমানে সময়ের ব্যবধানে দেশে চায়ের উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। কিন্তু উৎপাদনের মাত্র ১ শতাংশ রফতানি নেমে এসেছে। মূলত রফতানি প্রণোদনা নীতির কিছু শর্ত এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বিশ্ববাজারে ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে বাংলাদেশের চায়ের অবস্থান। ফলে সরকারকে অভ্যন্তরীণ বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ সামাল দিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। চা বোর্ড এবং চা শিল্প সংশ্লিষ্টদের সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, চা রফতানিতে সরকার বিগত ২০২০-২১ অর্থবছরে ৪ শতাংশ প্রণোদনা চালু করে। পরে তা কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হয় এবং চলতি অর্থবছরে আরো কমিয়ে ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। যদিও প্রণোদনা সুবিধা পেতে নানা শর্ত রয়েছে। বর্তমান নীতিমালায় বলা আছে, চা রফতানিতে প্রণোদনা পেতে হলে রফতানিকারককে অবশ্যই বাগান মালিক হতে হবে। আর ওই শর্তের কারণে প্রণোদনার বাইরে থেকে যাচ্ছে দেশের বেশির ভাগ সম্ভাব্য রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান। মূলত দেশের অধিকাংশ চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্র্যান্ড নেই। বিভিন্ন করপোরেট ও ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানই নিলাম থেকে চা কিনে বাজারজাত করে। আর বাগান মালিকদের মধ্যে সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানেরই কেবল নিজস্ব ব্র্যান্ড ও বিপণন ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে রফতানি সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রণোদনা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বৃহৎ একটি অংশ।
সূত্র জানায়, দেশ থেকে চা রফতানির সম্ভাবনা নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বরং রফতানি কমতে থাকায় দেশে উৎপাদিত অতিরিক্ত চা বাজারজাত করতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ বাজার সমপ্রসারণে কৃত্রিমভাবে উদ্যোগ নিতে হচ্ছে। যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। দেশে বিগত ২০০১ সালে ৫ কোটি ৩১ লাখ ৫০ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়। ওই বছর ১ কোটি ২৯ লাখ ১০ হাজার কেজি রফতানি হয়েছিল। পরের বছর রফতানি হয়েছিল ১ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার কেজি, ২০০৩ সালে ১ কোটি ২১ লাখ ৮০ হাজার, ২০০৪ সালে ১ কোটি ৩১ লাখ ১০ হাজার ও ২০০৫ সালে ৯০ লাখ ১ হাজার কেজি। কিন্তু সামপ্রতিক সময়ে দেশে চায়ের উৎপাদন বাড়লেও রফতানি নেমেছে তলানিতে। ২০২১ সালে ৯ কোটি ৬৫ লাখ ১০ হাজার কেজি উৎপাদনের বিপরীতে মাত্র ৬ লাখ ৮০ হাজার কেজি রফতানি হয়। তার পরের বছর ৯ কোটি ৩৮ লাখ ৩০ হাজার কেজি উৎপাদনের বিপরীতে ৭ লাখ ৮০ হাজার কেজি রফতানি হয়। ২০২৩ সালে দেশে রেকর্ড ১০ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার কেজি চা উৎপাদন হলেও রফতানি দাঁড়ায় ১০ লাখ ৪ হাজার কেজিতে। ২০২৪ সালে রফতানি বেড়ে ২৪ লাখ ৫০ হাজার কেজিতে পৌঁছলেও ২০২৫ সালে তা আবার কমে ১৬ লাখ ৪০ হাজার কেজিতে নেমে আসে। ওই বছর উৎপাদন ছিল ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার কেজি চা।
সূত্র আরো জানায়, চায়ের বাজার ভোক্তার চাহিদার ওপর নির্ভর করে। দেশীয় বাজার ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক থাকলে চায়ের বাজারও চাঙ্গা থাকে। তবে কভিড-১৯ থেকে টানা কয়েক বছর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কারণে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে চা বিপণন বাজারে মন্দা ভাব তৈরি হয়। তাতে উৎপাদকরা উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে চা বিক্রি করতে বাধ্য হয়। সরকারের পক্ষ থেকে চা শিল্পকে সুরক্ষা দিতে ২০১২ সালে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (রেগুলেটরি ডিউটি) আরোপ করা হয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ওই শুল্ক ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়। বর্তমানে চা আমদানিতে মোট ৮৯ দশমিক ৩২ শতাংশ শুল্ক কার্যকর রয়েছে। কিন্তু উচ্চশুল্কের কারণে আমদানি নিয়ন্ত্রণে এলেও রফতানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। ফলে উৎপাদন খরচ ও বাজারমূল্যের মধ্যে তৈরি হয়নি ভারসাম্য।
এদিকে চা-খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে দেশের চা খাত অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। খাতটিকে বাঁচিয়ে রাখতে আমদানি বন্ধ হলেও সংকট কাটেনি। বাধ্য হয়ে নিলামে চা বিক্রিতে ফ্লোর প্রাইস বসানো হয়েছে। তবে রফতানি বাড়াতে হলে প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু বাগান মালিক হওয়ার শর্ত প্রত্যাহার করা জরুরি। বর্তমানে বাংলাদেশের চা উৎপাদন ব্যয় প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেশি। নিয়মিত শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি, আবাসিক শ্রমিকদের সার্বিক দায়িত্ব বহন এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবের কারণে কঠিন হয়ে পড়েছে উৎপাদন ব্যয় কমানো। যে কারণে নানা সংকটের মধ্যে পড়েছে চা খাতের উদ্যোক্তারা। প্রণোদনা প্রাপ্তির সুযোগ থাকলেও রফতানির মতো বাণিজ্য পরিচালনার জন্য নগদ অর্থপ্রবাহের অভাবে বাগান মালিকদের অনেকেই নিরুৎসাহিত হচ্ছে। তবে রফতানি কম হলেও দেশের ক্রমবর্ধমান চায়ের চাহিদা মেটানোর মাধ্যমে আমদানি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান তৈরির কাজটি চা খাতের উদ্যোক্তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে করে যাচ্ছে।
অন্যদিকে দেশে সনাতনী চাষাবাদ পদ্ধতি ও শ্রমনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশে চা উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক বেশি। অনেক প্রতিযোগী দেশ প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে কমিয়ে এনেছে ব্যয়। তাছাড়া উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকায় উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ঋণ গ্রহণেও নানা জটিলতা তৈরি হয়। ফলে আধুনিকায়নে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগও।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ চা বোর্ডের সদস্য (অর্থ ও বাণিজ্য) ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি জানান, দেশে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে চায়ের ভোগ। উৎপাদন বাড়লেও তার বড় অংশই অভ্যন্তরীণ বাজারেই ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি কেনিয়া, শ্রীলংকা ও ভারতের মতো দেশগুলো বাংলাদেশের তুলনায় কম খরচে চা উৎপাদনে সক্ষম হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠেছে। তারপরও বাংলাদেশ গতানুগতিক চায়ের পাশাপাশি বৈচিত্র্যময় চা রফতানির বেশি চেষ্টা করছে। আর বাগান মালিকানার বাধ্যবাধকতার কারণে নিলাম থেকে চা কিনে রফতানি করতে আগ্রহী ব্যবসায়ীদের মধ্যে পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে না। বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে চা রফতানি উৎসাহিত করতে নেয়া হচ্ছে বিভিন্ন উদ্যোগও।