মাথায় লাল গামছা, কোমরে গোঁজা একটি বাঁশি আর মুখে সদালাপী এক চিলতে হাসি। দূর থেকে দেখলে মনে হবে কোনো এক লোকশিল্পী মেঠোপথ ধরে হেঁটে যাচ্ছেন। কিন্তু না, তিনি কোনো পেশাদার শিল্পী নন; তিনি সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামের এক অনন্য খামারী-মিন্টু মিয়া। তবে এলাকায় এখন তিনি এক নামে পরিচিত, ‘বাঁশিওয়ালা মিন্টু’। তার এক বাশির ফুতে চার-পাঁচ হাজার হাঁস সুশৃঙ্খলভাবে পিছু নেয়। বাঁশির চেনা সুরে হাঁসের দল যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার পেছনে ছুটতে থাকে। এই অদ্ভুত সুন্দর ও বিরল দৃশ্য দেখতে এখন প্রতিদিন ভিড় জমছে তার খামারে। মিন্টু মিয়ার এই সফলতার পেছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম আর ‘মায়ের দোয়া হাঁস খামার’। একসময় শূন্য হাতে শুরু করলেও আজ তিনি হাঁস পালন করে নিজের ভাগ্য বদলে ফেলেছেন। হাঁস বিক্রির আয় দিয়ে তৈরি করেছেন মাথা গোঁজার ঘর, কিনেছেন নিজের জায়গা-জমি। মিন্টু মিয়া জানান, তিনি এখন বেশ ভালো আছেন এবং স্বাবলম্বী। কলারোয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে তিনি এই ১২ মাসি হাঁসের খামার পরিচালনা করেন। একেকটি খামারে চার থেকে পাঁচ হাজার পর্যন্ত হাঁস লালন-পালন করেন তিনি। বর্তমানে প্রতিটি হাঁস বাজারে প্রায় ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা থেকে তার ভালো অঙ্কের মুনাফা আসছে।মিন্টুর এই সফলতার পেছনে পর্দার আড়ালের এক বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে চিকিৎসা ও পরামর্শ সেবা। আমেরিকান প্রবাসী চিকিৎসক ডাঃ মশিউর রহমানের সার্বিক সহযোগিতা ও চিকিৎসাসেবা এই খামারের হাঁসগুলোকে রোগবালাই থেকে মুক্ত রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে। আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে হাঁস পালনে এই চিকিৎসকের পরামর্শ মিন্টুর খামারকে আরও লাভজনক করে তুলেছে। মিন্টু মিয়া অত্যন্ত রসিক ও আনন্দপ্রিয় একজন মানুষ। তার খামার পরিচালনার কৌশল আর সবার চেয়ে আলাদা। ছোট্ট ছোট্ট হাঁসের বাচ্চাগুলোকে তিনি পরম মমতায় মায়ের মতো আগলে রাখেন। আর সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো তার বাঁশির জাদু। মাঠে বা জলাশয়ে হাঁস চরাতে গিয়ে মিন্টু যখনই কোমরের বাঁশিতে সুর তোলেন, হাজার হাজার হাঁস পাগলপায় হয়ে তার পেছনে পেছনে ছুটতে শুরু করে। চেনা মায়ের ডাকে সন্তানরা যেভাবে ছুটে আসে, মিন্টুর বাঁশির সুরে হাঁসগুলোর ছুটে আসার দৃশ্যটিও ঠিক ততটাই চমৎকার ও আবেগঘন।বাঁশির সুরে হাজার হাজার হাঁস তাড়িয়ে বেড়ানোর এই ব্যতিক্রমী ও চোখ জুড়ানো খবর এখন আর শুধু কলারোয়ার ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। এই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করতে এবং মিন্টুর সফলতার রহস্য জানতে দেশ খবরের প্রতিনিধি দলসহ বিভিন্ন জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেল, জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিক এবং জনপ্রিয় ইউটিউবাররা ছুটে আসছেন বোয়ালিয়া গ্রামে। মিন্টুর সাক্ষাৎকার ও তার হাঁস খামারের গল্প এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বেশ সাড়া ফেলেছে। হাঁস পালন যে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তনের হাতিয়ার হতে পারে, তার এক জীবন্ত উদাহরণ কলারোয়ার বাঁশিওয়ালা মিন্টু। সঠিক সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও মিন্টুর মতো উদ্যম থাকলে গ্রামীণ যুবসমাজ বেকারত্বের অভিশাপ মুছে নিজেদের ভাগ্য নিজেই গড়তে পারে-মিন্টুর ‘মায়ের দোয়া হাঁস খামার’ আজ সেই বার্তাই দিচ্ছে।