দৌলতপুরে এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে

ব্যবহারিক পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ

এফএনএস (মোঃ সাইফুল ইসলাম শাহিন; দৌলতপুর, কুষ্টিয়া) : | প্রকাশ: ২০ জুন, ২০২৬, ০৬:৫০ পিএম
ব্যবহারিক পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার জেএমজি মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ২০২৬ সালের এসএসসি ব্যবহারিক পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেয়া সহ নানা অনিয়ম ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অনতিবিলম্বে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের শাস্তি এবং আদায়কৃত অতিরিক্ত অর্থ ফেরতের দাবিতে শিক্ষা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ব্যবহারিক পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও কেন্দ্র পরিচালনা নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক তৈরি হয়। জেএমজি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উপজেলা সহকারী প্রোগ্রামার সোহেল রানাকে কেন্দ্র সচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, শিক্ষা বোর্ডের নির্ধারিত সময়সূচি (৭-১২ জুন) উপেক্ষা করে কেন্দ্র সচিবের নির্দেশনায় প্রথমে ৩ জুন ব্যবহারিক পরীক্ষা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক ও জানাজানি হলে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আগেভাগে অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যেই বোর্ডের নিয়ম ভেঙে এই পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

পরবর্তীতে বোর্ডের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ৭ জুন থেকে ব্যবহারিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও অর্থ আদায়ের বিষয়টি বন্ধ হয়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভাগভেদে অর্থ আদায় করা হয়েছে; যেখানে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১০০ টাকা এবং বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২০০ টাকা করে নেওয়া হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজ্ঞান বিভাগের এক পরীক্ষার্থী বলেন, আমাদের ব্যবহারিক পরীক্ষার নাম করে কোনো রসিদ ছাড়াই ২০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। টাকা দেওয়ার সময় শিক্ষকরা পরিষ্কার বলে দিয়েছিলেন-টাকা না দিলে প্র্যাক্টিক্যাল খাতায় স্বাক্ষর করা হবে না এবং পরীক্ষায় নম্বর কমিয়ে দেওয়া হবে। বাধ্য হয়ে আমরা সবাই টাকা দিয়েছি। আমরা এর বিচার চাই। একাধিক সূত্রের দাবি, ব্যবহারিক পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সর্বমোট প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা অবৈধভাবে আদায় করা হয়েছে। অথচ নিয়মানুযায়ী ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য অতিরিক্ত কোনো অর্থ আদায়ের বিধান নেই। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দৌলতপুর উপজেলার অন্য কোনো কেন্দ্রে এমন অর্থ আদায় না হলেও কেবল জেএমজি মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেই এই নিয়মবহির্ভূত কাজ করা হয়েছে।

এদিকে, এই অবৈধ অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে কেন্দ্র-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে গত বৃহস্পতিবার দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে কেন্দ্র-সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগ উঠেছে, সভায় অর্থ বণ্টন নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হলেও, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেওয়া কিংবা কেন এই অর্থ উত্তোলন করা হলো-সে বিষয়ে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এতে অভিভাবক ও সচেতন মহলের মনে নতুন করে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলার একাধিক প্রধান শিক্ষক বলেন, বোর্ডের নির্ধারিত সময়সূচি ও বিধিমালা অনুসরণ করেই ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়ার কথা। কোনো শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ নেই। অভিযোগগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং তদন্ত সাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কেন্দ্র সচিব সোহেল রানা অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১২০ টাকা আদায় করা হয়েছে । জেএমজি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোখলেসুর রহমান ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিক্ষক এই টাকা আদায় করে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করেছেন। তবে এই অর্থের কোনো অংশ তিনি গ্রহণ করেননি  বললেও ব্যবহারিক পরীক্ষার সম্মানী হিসেবে ৫ হাজার টাকা পেয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে জেএমজি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোখলেসুর রহমানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

কুষ্টিয়া জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু তৈয়ব মোঃ ইউনুছ আলী বলেন, বোর্ডের নির্ধারিত ফি ছাড়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। যোগাযোগ করা হলে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ জানান,  বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।এ দিকে সচেতন এলাকাবাসী দুর্নীতিগ্রস্ত এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিক্ষামন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে