খুলনায় ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশ

আর একটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে: শফিকুর রহমান

এফএনএস (এম এ আজিম; খুলনা) :
| আপডেট: ২০ জুন, ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম | প্রকাশ: ২০ জুন, ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম
আর একটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে: শফিকুর রহমান

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও  বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। এই বিপ্লব কোনো দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য নয়, কোনো গোষ্ঠী এবং পরিবারকে তোষামোদ করার জন্য নয়। কোনো আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করার জন্য নয়। বরং দুনিয়ার বুকে স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সম্মান, ইজ্জত, শক্তি, সাহস নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ানোর জন্য হবে আগামীর বিপ্লব। সেই অনিবার্য বিপ্লবের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য যুবকদের প্রতি আহবান জানান তিনি। 

যুব সমাজের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে আপনারা ফ্যাসিবাদকে বিদায় করেছেন। এখন নব্য ফ্যাসিবাদকে বিদায় জানাতে প্রয়োজন হলে আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত থাকুন। শোষণমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত, দলীয় প্রভাবমুক্ত একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য যুব সমাজের প্রস্তুত থাকতে হবে।  শনিবার (২০ জুন) বিকেলে খুলনা সার্কিট হাউজ ময়দানে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ লাঘবসহ বিভিন্ন দাবিতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের খুলনায় বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

জামায়াত আমির বলেন, বিএনপি জাতির সাথে দেওয়া কথা রাখেনি। আমরা বিএনপিকে বলছি, আপনারা ভুল করছেন,  দেশ এবং জাতির স্বার্থে ভুল সংশোধন করে জনগণের কাতারে আসুন। জনরায়কে সম্মান করুন, জনরায়কে অসম্মান করার পরিণতি কি হতে পারে দফায় দফায় দেখার পরেও যদি শিক্ষা না হয়, জীবনেও আপনাদের শিক্ষা হবে না।

তিনি বলেন, খুলনাবাসী আপনারা যে রায় দিয়েছিলেন, সেই রায়টিই আপনাদের কাছে চেয়েছিলাম। আর আমরা বলেছিলাম, এই রায় বাস্তবায়ন করা হবে সংসদে গিয়ে, আমাদের দায়িত্ব। কিন্তু চুরি, ডাকাতি, ইঞ্জিনিয়ারিং করে ভোট কেড়ে নেওয়া হয়েছে, নেওয়া হোক। আমরা সংসদে যা আছি তাই নিয়ে আমরা সিংহের মতো লড়াই করে যাব। আমরা জানি সহজে কানে পানি ঢ়ুকবে না, তখন সিরিঞ্জ দিয়ে যদি ঢ়ুকাতে হয়, তাহলে আমরা ঢ়ুকাব। যদি ফয়সালা সংসদে না হয়, তাহলে যেখানে কথা বলতে যেখানে মাননীয় স্পীকার বলতে হয় না, যেখানে কথা বলতে স্পীকারের অনুমোদন লাগে না। সেই খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুর. রাজশাহী, বগুরার মাঠ সব জায়গা থেকে আগ্নেয়গিরি তৈরি হবে। এই আগ্নেয়গিরির দাবানলে সমস্ত আবর্জনা পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, শত যন্ত্রণা বুকে নিয়ে নির্বাচনের ফলাফলকে আমরা মেনে নিয়েছি। দেশে একটা গৃহযুদ্ধ শুরু না হোক সেই জন্য আমরা মেনে নিয়েছিলাম। আমরা কারও বাপ-দাদার চোখ রাঙানোকে পরোয়া করবো না। অন্যায়ের কাছে আমরা মাথা নত করবো না। আমাদের নেতৃবৃন্দ হারতে হারতে ফাঁসির তক্তায় দাঁড়িয়ে মুচকি হাসি দিয়ে শিখিয়ে দিয়েছেন জাতির জন্য প্রয়োজনে তোমাদেরকেও এই মুচকি হাসি দিতে তৈরি থাকতে হবে। খানজাহান আলী, শাহাজালালের এই বাংলাদেশে জনগণ সেই মুচকি হাসি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত।

তিনি বলেন,  সরকারকে স্পষ্ট বলে দিচ্ছি, যদি এই দেশবাসী এবং আমরা দেখতে পাই আধিপত্যবাদের সামনে আপনারা মাথা নত করছেন, আপনাদেরকেও আমরা ছেড়ে কথা বলবো না। সাবধান, ২০ কোটি মানুষের ২৪ কোটি হাত আজ প্রস্তুত।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সীমান্তে সুড়সুড়ি দেওয়া হচ্ছে। পুশইনের নামে একটা দেশে তাদের নাগরিকদের অবৈধভাবে আমাদের দেশে ফেলে দিতে চাচ্ছে। আমাদের মুষ্টিমেয় বিজিবি সদস্য সীমান্তে যখন দাঁড়িয়ে গিয়েছে, জনগণ তখন তাদের ডান হাতে পরিণত হয়েছে। এই ডান হাত সারা বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষ। আমরা চাই না আমাদের কোনো প্রতিবেশীর ঘুম এবং শান্তি কেড়ে নিতে। আবার কোনো প্রতিবেশী আমাদের দিকে তাদের কালো হাত বাড়াক, ওইটাও আমরা চাই না। যদি কেউ আমাদের দিকে কালো হাত বাড়ায়, মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে বলছি- সেই কালো হাত ভেঙে দেওয়া হবে ইনশাআল্লাহ।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, তারা মানুষকে বৈষম্যহীন সমাজ, সম্পদ লুণ্ঠন না করা, হত্যার রাজনীতি বন্ধ করা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ওয়াদা দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু তারা প্রতিটি ওয়াদা লঙ্ঘন করেছে। রাষ্ট্রের সকল বাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে নির্বিচারে মানুষ খুন ও পঙ্গু করা হয়েছে। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দম্ভোক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, যারা একসময় দম্ভ করে বলতেন হাসিনা পালায় না, শেষ পর্যন্ত তীব্র জনস্রোতের মুখে সেই হাসিনাকেই অপমানজনকভাবে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে। ১৫ বছর যাদের সেবাদাসী হিসেবে কাজ করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাদের কোলেই গিয়ে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বর্তমানদের সতর্ক করে বলেন, জনরায়কে সম্মান না করার পরিণতি কী হতে পারে, তা এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের সভাপতিত্বে খুলনা বিভাগীয় সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. অলি আহমদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমির সাখাওয়াত হোসাইন, জাগপার সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান প্রমুখ।

সমাবেশে সম্মানিত অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমীর মাওলানা হাবীবুল্লাহ মিয়াজী,বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম সোবহানী, এবি পার্টির যুগ্ম সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন, বিভাগীয় সমাবেশ বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়ক মোবারক হোসাইন, জামায়াতের খুলনা অঞ্চল পরিচালক অধ্যক্ষ মোঃ ইজ্জত উল্লাহ এমপি, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক এমপি এবং মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এমপি।

অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন, নগর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, জেলা আমির মাওলানা এমরান হোসাইন, সাতক্ষীরা জেলা আমির উপাধ্যক্ষ শহীদুল ইসলাম মুকুল, বাগেরহাট জেলা আমির মাওলানা রেজাউল করিম, ঝিনাইদহ জেলা আমির আলী আজম মোঃ আবু বক্কর এমপি, যশোর জেলা আমির অধ্যাপক মোঃ গোলাম রসুল, মেহেরপুর জেলা আমির মাওলানা তাজ উদ্দীন খান এমপি, চুয়াডাঙ্গা জেলা আমির অ্যাডভোকেট রুহুল আমীন এমপি, নড়াইল জেলা আমির মোঃ আতাউর রহমান বাচ্চু এমপি, লেবার পার্টির অধ্যক্ষ মোঃ সাইফুদ্দোহা, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুফতি শরীফ সাইদুর রহমান, এনসিপির আহম্মদ হামীম রাহাত, এবি পার্টির মোঃ আবু বক্কর সিদ্দিক মোড়ল, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মোঃ জাকির হোসেন খান, খেলাফত মজলিসের এফ এম হারুন অর রশীদ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মাওলানা মোঃ ইব্রাহিম খলিল, জাগপা’র মোঃ সাব্বির আহমেদ, বিডিপি’র অ্যাডভোকেট মোঃ হানিফ উদ্দীন প্রমুখ।

সভাপতির বক্তৃতায় মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ১১ দলীয় জোটের খুলনা বিভাগীয় সমাবেশের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। তিনি দাবি করেন, নির্বাচনের আগে রাষ্ট্র সংস্কার ও ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, ক্ষমতায় যাওয়ার পর সরকার তা থেকে সরে এসেছে। গণভোটে জনগণ যে সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে সরকার অনীহা দেখাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, গণভোটে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, দলীয়করণ বন্ধ এবং বিচারব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। অথচ বর্তমানে সেই সংস্কার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। জনগণের রায়কে অগ্রাহ্য করে সরকার কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার দিকে এগোচ্ছে।

বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় কর্ণেল অব: অলি আহমদ বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের যে উদ্যোগ নিয়ে জনগণ ভোট দিয়েছে, তা কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থে নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে। তিনি বলেন, এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে যেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে না পারে, বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এবং জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয়।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, জুলাই সনদ আর গণভোটের সাথে বিএনপি অন্তহীন প্রতারনা করেছে। তারা তলে তলে না ভোটের ক্যাম্পেইন করেছে। গণভোটে ‘না’ এর পক্ষেই তারা প্রচারনা চালিয়েছে। গণভোটে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ জুলাই সনদের পক্ষে মত দিয়েছে এবং রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সেই রায়কে উপেক্ষা করে কেবল সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে তা জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের শামিল হবে।

এনসিপির মূখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, ‘বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি বড় লড়াই রয়েছে- রাষ্ট্র সংস্কারের বাস্তবায়ন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আওয়ামী লীগের বিচার নিশ্চিত করা। জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে কোনো আপস করা হবে না। সংস্কার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আমরা রাজপথে যেমন ছিলাম, ভবিষ্যতেও তেমনি থাকব।’ বিএনপির সমালোচনা করে নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, ‘গণতন্ত্র ও সংস্কারের প্রশ্নে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে বিএনপি ব্যর্থ হচ্ছে। ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী শক্তির বিরুদ্ধে অপপ্রচার বন্ধ করে জনগণের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে। অন্যথায় জনগণই তার জবাব দেবে।’

তিনি আরও বলেন, খুলনাসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ করা হয়েছে। কেসিসি, কেডিএ, জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক বসানো তার বড় প্রমাণ। তিনি দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহবান জানিয়ে বলেন, কোনো বিভ্রান্তি বা অপপ্রচারে কান না দিয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। এর আগে দুপুর ২টার দিকে সমাবেশের কাজ শুরু হয়। বিভাগের ১০ জেলা ছাড়াও আশেপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে সকাল থেকেই মানুষ সমাবেশস্থলে আসতে থাকে। নির্ধারিত সময়ের আগেই সার্কিট হাউজ মাঠ সহ আশেপাশের সকল সড়ক ও অলিগলি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে