বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ

মেধা না দলীয় আনুগত্য?

এফএনএস | প্রকাশ: ২২ জুন, ২০২৬, ০৩:০২ পিএম
মেধা না দলীয় আনুগত্য?

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয়করণের অভিযোগে আলোচিত। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক নেতৃত্বেও পরিবর্তন এসেছে; কিন্তু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার যে প্রত্যাশা ছিল, সাম্প্রতিক উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে ওঠা বিতর্ক সেই প্রত্যাশাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর অল্প সময়ের মধ্যেই অন্তত ২৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পরিবর্তন করা হয়েছে। একইসঙ্গে প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার পদেও নতুন নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, গবেষণা, প্রকাশনা, একাডেমিক যোগ্যতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা বিবেচনা করেই এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের একটি অংশের অভিযোগ, বাস্তবে রাজনৈতিক পরিচয় ও দলীয় ঘনিষ্ঠতাই অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছে। এখানে মূল প্রশ্ন ব্যক্তি বা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নয়; প্রশ্ন হলো নীতি ও প্রক্রিয়ার। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও মুক্তবুদ্ধির পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের ওপর বর্তায়। ফলে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে বিবেচিত হওয়া উচিত একাডেমিক উৎকর্ষ, প্রশাসনিক সক্ষমতা, নেতৃত্বের গুণাবলি এবং নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা। রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকা কোনো নাগরিকের জন্য অপরাধ নয়, কিন্তু নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তবে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কিছু ক্ষেত্রে নিয়োগের পরপরই তা বাতিল করা হয়েছে বা স্বল্প সময়ের মধ্যে পরিবর্তন করতে হয়েছে। এতে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও যাচাই-বাছাইয়ের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। একই সঙ্গে বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বাইরের শিক্ষকদের নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আইনগত বাধা না থাকলেও বাস্তবতার বিচারে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া অধিক যৌক্তিক। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি-গবেষণার সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির চাপ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে না রেখে মেধা, যোগ্যতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে পরিচালিত করা জরুরি। সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকারেও মেধাভিত্তিক নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হলে উপাচার্য নিয়োগে স্বচ্ছ সার্চ কমিটি, সুস্পষ্ট মানদণ্ড এবং জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো দলের নয়; এগুলো জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের কেন্দ্র। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থ ও একাডেমিক উৎকর্ষকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া সময়ের দাবি।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে