কালীগঞ্জে ৫৬ বছর ধরে খলিলুর রহমান রেডিও শুনছেন

এফএনএস (টিপু সুলতান; কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ) :
| আপডেট: ৩০ জুন, ২০২৬, ০১:০২ পিএম | প্রকাশ: ৩০ জুন, ২০২৬, ০১:০২ পিএম
কালীগঞ্জে ৫৬ বছর ধরে খলিলুর রহমান রেডিও শুনছেন

এক সময় রেডিও ছিল তথ্য জানার প্রধান উৎস এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, কিন্তু স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট-এর সহজলভ্যতার কারণে রেডিওর ব্যবহার নেই বললেই চলে। রেডিও ছিল একটা সময় শহর কিংবা গ্রামের খুবই জনপ্রিয়। আধুনিকতার ছোঁয়া হলেও বর্তমানে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে যন্ত্রটি। অনেকের বাসায় রেডিও থাকলেও এখন আর কেউ যন্ত্রটি দিয়ে গান কিংবা অনুষ্ঠান শোনেন না। আগে মানুষ রেডিওর মাধ্যমে বিনোদন, সংবাদ সবকিছুই জানতো।কিন্তু ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের খলিলুর রহমান(৭৬) দীর্ঘ ৫৬ বছর ধোরে একটানা রেডিও প্রেমিক এখন ও নিয়মিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও খবর শুনে থাকেন।

কালীগঞ্জ উপজেলার চাপরাইল গ্রামের মৃত সাবেক ইউপি চেয়ারম্যন রফি উদ্দিনের ছেলে খলিলুর রহমান বলেন,১৯৬৮ সালে এসএসসি পাশ করেন এবং ১৯৭১ সাল থেকে রেডিওতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান শুনে থাকেন। তিনি বলেন,রেডিও শুধু শ্রবন ও অদর্শন মাধ্যম হওয়ায় এর শ্রোতার সংখ্যা খুবই কম। বর্তমান প্রজন্ম (শ্রোতা)ঝুঁকছেন প্রতর্শিত পকেটজাত স্মাটফোনের দিকে। এতে ঐতিহ্যবাহৗ গণমাধ্যম রেডিও সেট প্রায় বিলুপ্তির পথে।অনেকের কাছে গুরুত্ব হারালেও দীর্ঘ ৫৬ বছর ধরে রেডিও শুনছেন খলিলুর রহমান। কথাটা শুনতে অবাক লাগলেও এটাই বাস্তব। রেডিওর প্রতি খলিলুর রহমানের রয়েছে টান ও ভালোবাসা।এক সময় রেডিওর কী জৌলুস ছিল। বাপ-দাদারা কৃষি কাজের ফাঁকে রেডিওতে নানা অনুষ্ঠান শুনত। দেশ-বিদেশের সংবাদ জানত।তখন সবার ঘরে রেডিও ছিল না।পাড়াপড়শীরা মিলে ভাওয়াইয়া গান, পালাগান, জারি-সারি, মুর্শিদী, নাটক, অনুরোধের আসনের গান, ভাটিয়ালির মতো লোক শিকড়ের গান শুনত। এমন কী হালচাষ, নিড়ানিতে ক্ষেতের আইলে রেখে শুনত রেডিও। এ থেকে জড়িয়ে পড়ি রেডিও শোনার নেশায়।আধুনিক যুগেও রেডিও শোনার কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, মোবাইলে বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যম সহজ হয়েছে ঠিকই। কিন্তু আগের সুস্থ বিনোদনের স্থলে দিন দিন মোবাইলে বাড়ছে অপসংস্কৃতির চর্চা। যেমন টিকটক, ব্ল্যাকমেইলিং,পর্নোছবি ও ভিডিও। এ কারণে সুস্থ বিনোদন ধারার রেডিও শুনি। 

বর্তমানে তিনি ভারতের এস, আর,পি ব্রান্ডের রেডিও শুনে থাকেন ও ৩ টা করে বড় ব্যাটারি লাগাতে হয়। দুঃখ্যের সাথে বলেন এ ব্যাটারি সংগ্রহ করা অনেকটা কষ্ট সচারাচর পাওয়া যায় না। তিন টা ব্যাটারি কিনতে হয় ৩০০ টাকা দিয়ে ও যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। পুরো জেলা-উপজেলায় রেডিওর দোকান তো নাই, হাতে গোনা দু/একজন মেকার থাকলেও কোনো যন্ত্র মিলে না ফলে বিভিন্ন শহরে বড় মেকারের নিকট থেকে অর্ডার দিয়ে নিতে হয়। খলিলুর রহমান প্রতিদিন রাত ১১ টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত ভারতের হারানো দিনের গান ও খুলনা বেতার কেন্দ্রের প্রতিদিন বিকাল ৫ টায় কৃষি অনুষ্ঠান শোনেন। ১৯৭১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ন্যাশনাল,সন্তোষ,ফিলিস্প, রেডিও ক্রয় করেছেন ৭টি। বর্তমানে এস,আর,পি রেডিও ব্যবহার করছেন। এটা প্রায় ৭ বছর ধোরে শুনছেন ও ৬৫০ টাকা দিয়ে ক্রয় করেছেন। তিন,শ টাকায় ৩ টা ব্যাটারি আড়াই থেকে তিন মাস চালানো যায় বলে তিনি জানান।কালীগঞ্জের চাপরাইল গ্রামের খলিলুর রহমান সৌখিন প্রিয় বিছানায় বালিশের পাশে আজও রেডিও বাজে। টেলিভিশন আবিস্কারের পর আস্তে আস্তে শহর এলাকায় রেডিওর ব্যবহার কমতে থাকলেও গ্রামে তার ব্যবহার কমেনি। কিন্তু আজ সময়ের ব্যাপ্তিকালে রেডিও একবারেই বিলুপ্ত হয়েছে।রেডিওতে শুধু শোনার ব্যবস্থা থাকার কারণে তার গুরুত্ব বেশি ছিলো। এক কথায় বলতে গেলে তথ্য জানার জন্যে সকলেই কান পেতে থাকতো।এছাড়াও সরকারি উন্নয়ন, পরিকল্পনা,স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, সংস্কৃতি,আবহাওয়াসহ চলমান বিভিন্ন তথ্যবহুল সংবাদ জানার ও বিনোদনমূলক বিভিন্ন গান শোনার একমাত্র মাধ্যমই ছিলো রেডিও। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পট-পরিবর্তনে তথ্য সরবরাহের কাজ করেছে রেডিও।

কালীগঞ্জ শহরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ি মুশফিকুর রহমান বলেন, আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন আমাদের এক বাড়িতে রেডিও ছিল। সেখানে সন্ধ্যার পরই আমরা বসে মধ্যরাত পর্যন্ত বিভিন্ন গান, নাটক, পালা ও খবর শুনতাম। খবরের জন্য একসময় বিবিসি বাংলা রেডিও ছিল অসংখ্য মানুষের ভরসার নাম।সকাল, সন্ধ্যা ও রাতে রেডিও নিয়ে বসে থাকত মানুষ। স্টেশন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিবিসি বাংলা ধরাতে বেগও পেতে হতো। বেজে উঠত ‘বিবিসি বাংলা। সোনিয়া রহমান বলেন, এখন আমাদের সন্তানরা রেডিও কিভাবে চালাতে হয় তা বলতে পারে না।খুলিলুর রহমান পেশায় কাপড়ের দোকানের টেইলার মাষ্টার।তিনি বলেন আজকের শিশুকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, রেডিও কী?-তারা বেশির 

ভাগই থমকে যায় ও কেউ ভাবে এটা হয়তো কোনো পুরোনো যন্ত্র। তারা জানে না রেডিও শরীরে হাত চালিয়ে ভলিউম বাড়ানো বা ফ্রিকোয়েন্সি মিলিয়ে নিতে নিতে হালকা“ঝিঁ ঝিঁ”শব্দ শোনা কতটা পরিচিত ছিল।জানে না দুপুরের অবসর বা সন্ধ্যার আড্ডা কীভাবে মাত্র দুটি বোতামে সাজানো খবর,গান,নাটক,কণ্ঠনাট্য,গল্প আর মানবজীবনের গাঢ় স্মৃতিগুলো দিয়ে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে