সরকারের একাধিক বিভাগে সচিব না থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে ধীরগতি

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২ জুলাই, ২০২৬, ০৮:০৮ এএম
সরকারের একাধিক বিভাগে সচিব না থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে ধীরগতি

সরকারের একাধিক বিভাগে সচিব না থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে ধীরগতি বিরাজ করছে। বর্তমানে শূন্য রয়েছে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ চারটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের শীর্ষ প্রশাসনিক পদ। অথচ বর্তমানে কার্যকর কোনো দপ্তরের দায়িত্ব ছাড়াই রয়েছেন ১০ জন সচিব। তাদের মধ্যে ৯ জনকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রাখা হয়েছে। আর একজন সচিব পদে পদোন্নতি ও পদায়ন পেলেও এখনো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব নেননি। জনপ্রশাসন বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সচিব পদে বর্তমানে কোনো কর্মকর্তা কর্মরত নেই। ওসব দপ্তরের কার্যক্রম আপাতত পরিচালনা করছেন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কর্মরত মোট ৮৪ জন সিনিয়র সচিব ও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তার মধ্যে বর্তমানে কোনো দপ্তরের দায়িত্বে নেই ১০ জন। তাদের মধ্যে ৯ জনকে সংযুক্ত রাখা হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। আর এখনো কোনো দপ্তরে যোগদান করেননি একজন।

সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয় বা বিভাগের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে সচিব দায়িত্ব পালন করেন। ওই কর্মকর্তা প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আর্থিক শৃঙ্খলা ও নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এমন পরিস্থিতিতে কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগে দীর্ঘ সময় পূর্ণকালীন সচিব না থাকলে তৈরি হয় প্রশাসনিক কার্যক্রমে ধীরগতি ও সমন্বয়হীনতার ঝুঁকি। বর্তমানে সরকারের ৫৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ রয়েছে। তার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর। কারণ তা সরকারপ্রধানের কার্যালয়। কিন্তু বর্তমান সরকার গঠনের পর দপ্তরে এখনো পর্যন্ত নিয়োগ হয়নি কোনো সচিব। তার অধীনস্থ দপ্তরগুলো হলো গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট (জিআইইউ), বেসরকারি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (পিইপিজেড), এনজিও বিষয়ক ব্যুরো, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা), বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ (পিপিপি), জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ), স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)।

সূত্র আরো জানায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিশ্ব বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে। ওই মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ দপ্তর-সংস্থাগুলো হলো বাংলাদেশ ট্রেড এবং ট্যারিফ কমিশন, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তর, আমদানি ও রফতানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের অফিস, বাংলাদেশ চা বোর্ড, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন, বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট, বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিল, দ্য ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টস অব বাংলাদেশ, দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ এবং ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ। দায়িত্বরত বাণিজ্য সচিব গত ১৭ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করলে এখনো ওই পদে কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। এতোদিন অতিরিক্ত সচিব ওই সময়ে মন্ত্রণালয়ে সচিবের চলতি দায়িত্ব পালন করছিলেন। কিন্তু গত ঈদের ছুটির মধ্যে সরকার তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব থেকে সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ দেয়। কিন্তু তিনি এখনো ওই পদে যোগদান করেননি। ফলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে সচিবের পদটি ফাঁকা রয়েছে এখনো। তাছাড়া বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সরকারের অন্যতম আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর। তার অধীনে রয়েছে বিজেএমসি, বিটিএমসি, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড, পাট অধিদপ্তর, বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড, বস্ত্র অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পাট করপোরেশন, জেডিপিসি এবং লিকুইডেশন সেল। তবে বর্তমানে ওই মন্ত্রণালয়ে কর্মরত নেই কোনো সচিব। আর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীনস্থ দপ্তরগুলো হলো বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি), বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক অথরিটি, ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর সার্টিফিকেট প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (সিসিএ), তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর, জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সি, বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড (বিডিসিসিএল), স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড এবং এজেন্সি টু ইনোভেট (এটুআই)। বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে কর্মরত নেই কোনো সচিব। 

এদিকে জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সরকারের জন্য সিভিল সার্ভিসে দলাদলি, বিভাজন ও একে অন্যকে পেছনে ফেলার প্রবণতা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আমলাতন্ত্রে যোগ্য ও উপযুক্ত কর্মকর্তাদের বাছাই, সঠিক পদায়ন এবং পুরো ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ প্রশাসনে এখনো ব্যাপক দলাদলি, নানা ধরনের লবিং এবং পদ-পদবিকে ঘিরে উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে। সিভিল সার্ভিসের ভেতরের বিভাজন ও দলাদলি মোকাবেলা করে প্রশাসনকে গুছিয়ে আনতে সরকারের সময় লাগবে। 

অন্যদিকে জনপ্রশাসনের সার্বিক বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জানান, সরকার মাত্র এসেছে। বর্তমান গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে দেখে-শুনে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা হলো সততা, স্বচ্ছতা, মেধা ও দক্ষতাকে মূল্যায়ন করতে হবে। সে অনুযায়ী সব বিভাগে কাজ চলছে। তবে দীর্ঘদিন পরে সেটআপ করতে একটু সময় তো লাগবেই। সবকিছুই ঠিকভাবে চলছে। যেসব জায়গায় পদায়ন প্রয়োজন, সেভাবেই পদায়ন হচ্ছে। যেকোনো সময় খালি পদগুলো পূরণ হয়ে যাবে। একজন কর্মকর্তা এক জায়গায় গেলে আরেক জায়গা খালি হয়, কিন্তু কাজ তো বন্ধ নেই। প্রশাসন মোটামুটি সেটআপ হয়ে গেছে। সব জায়গায় ইতিবাচকভাবে কাজ চলছে। কোথাও কোনো ডেডলক নেই।