বিলুপ্তির পথে স্বাধীনতার আগে গড়ে ওঠা রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্প

এম এম মামুন; রাজশাহী | প্রকাশ: ৮ জুলাই, ২০২৬, ০৪:২৮ পিএম
বিলুপ্তির পথে স্বাধীনতার আগে গড়ে ওঠা রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্প
রাজশাহী মহানগরীর হোসনিগঞ্জ এক সময় ছিল বেত শিল্পের জন্য সুপরিচিত। স্বাধীনতার আগেই এখানে গড়ে উঠেছিল ‘বেত পট্টি’। সেই সময়ে ১৫ থেকে ২০টি দোকানে তৈরি হতো দৃষ্টিনন্দন সব বেতের সামগ্রী। ঘর সাজানোর সৌখিন জিনিস থেকে শুরু করে নিত্য প্রয়োজনীয় আসবাব সবই মিলত এই বাজারে।তখনকার দিনে সিলেট থেকে আগত দক্ষ কারিগররা রাজশাহীতে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তাদের হাতের কাজ ছিল অসাধারণ। রাজশাহীর মানুষ সেই প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হন, এবং ধীরে ধীরে নিজেরাও বেত শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে এই শিল্পই হয়ে ওঠে এ শহরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। রাজশাহীর নববধূরা বিয়ের সময় উপহার হিসেবে বেতের তৈরি ট্রে, ঝুড়ি বা চেয়ার পেতেন। এটি তখন এক ধরনের সামাজিক মর্যাদা হিসেবেও বিবেচিত হতো। এক সময় সিলেট থেকে একদল লোক রাজশাহীতে আসেন। নগরীর শেখপাড়ায় তাঁরা গড়ে তোলেন বেতপট্টি। কারিগর ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের কোলাহলে মুখর হয়ে থাকত পুরো এলাকা। সেটি এখন প্রায় নীরব। বিলুপ্তির পথে স্বাধীনতার আগে গড়ে ওঠা রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্প। জানা যায়, ৭০ বছর আগে সিলেট থেকে রাজশাহী এসে বেতের ব্যবসা শুরু করেছিলেন ফরিদুর রহমান। সিলেট থেকে আসা অন্যান্যদের মধ্যে একমাত্র ফরিদুর রহমান বেঁচে আছেন এই শিল্পের জীবন্ত ইতিহাস হয়ে। ওই সময় থেকে তিনি বেতশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন। ফরিদুর রহমানের সিলেট নগরীর কাজী বাজার এলাকায় তাঁদের বাড়ি ছিল। ফরিদুর রহমান মাত্র দেড় বছর বয়সে বাবাকে হারান। ১৫ বছর বয়সে হারান মাকেও। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়ায় পৃথিবীতে আর আপন বলতে কেউ ছিল না। তখন দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের হাত ধরে রাজশাহীতে আসেন। সেই আসাটাই হয়ে যায় তাঁর জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সফর। রাজশাহীর মাটিতেই গড়েছেন সংসার, ব্যবসা। কিন্তু সিলেট শহরের কাজীবাজারের সেই পৈতৃক ভিটায় আর তাঁর জায়গা হয়নি। এখন তাঁর স্বজন হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন যেন এই বেতশিল্প। নগরীর শেখপাড়ার সরু রাস্তায় ঢুকতেই চোখে পড়ে বেতের তৈরি চেয়ার, মোড়া, ঝুড়ি আর আয়নার ফ্রেম। তিনটি দোকানের একটিতে পাওয়া যায় ফরিদুর রহমানকে। ফরিদুর রহমান বলেন, দেশের বাড়িতেই বেতের কাজ শিখেছিলেন। রাজশাহীতে এসে সে দক্ষতাকেই পুঁজি করেন। প্রথম দিকে তৎকালীন রাজশাহী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও ক্যাডেট কলেজের কিছু কাজের সুযোগ পান। ধীরে ধীরে নিজের শ্রম, দক্ষতা আর সততার ওপর ভর করে গড়ে তোলেন ব্যবসা। এক সময় তাঁর অধীনে ২০ থেকে ২২ জন কারিগর কাজ করতেন। শহরের বিভিন্ন জায়গায় ছিল একাধিক দোকান। নগরীর বেতপট্টি এলাকায় এখন মাত্র তিনটি দোকানই টিকে আছে। এর মধ্যে একটা ফরিদুর রহমানের। দোকানের চারপাশে ছড়িয়ে আছে কাঁচামাল-বাঁশের কাঠি ও কাঁচা বাঁশ। পেছনে ঝুলছে বিভিন্ন আকারের সুন্দরভাবে তৈরি করা বাঁশের দোলনা বা আরামদায়ক চেয়ার, যা এই শিল্পের বৈচিত্র্য ও নান্দনিকতার প্রমাণ দেয়। বিক্রয়ের জন্য থরে থরে সাজানো আছে আকর্ষণীয় ডিজাইন ও রঙের বৈচিত্র্যময় বাঁশের ঝুড়ি। লাল, সবুজ ও কালো রঙের সংমিশ্রণে তৈরি এই ঝুড়িগুলো ঘরের সৌন্দর্যবর্ধন বা ব্যবহারের জন্য উপযোগী। দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রমের ছাপ তাঁর মুখে স্পষ্ট হলেও, তাঁর শান্ত ও গভীর চাহনিতে এখনো টিকে থাকার এক অদ্ভুত মনোবল পরিলক্ষিত হয়। ফরিদুর শুধু একজন দক্ষ কারিগর নন, একজন উদ্ভাবকও। তিনি জানান, স্বাধীনতার আগে ভয়াবহ বন্যায় বেতের সংকট দেখা দিলে কারখানার কাজ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। তখন একদিন চায়ের দোকানের সামনে ঝুলতে থাকা প্লাস্টিকের সরু ফিতা দেখে মাথায় আসে নতুন চিন্তা। তখনকার সময়ে পাকিস্তানের করাচির এক কোম্পানি থেকে সেই প্লাস্টিকের সুতা এনে শুরু করেন প্লাস্টিকের বোনা আসবাব তৈরির কাজ। তখন অনেকেই তাঁকে পাগল বলেছিলেন। কেউ বিশ্বাস করেনি প্লাস্টিক দিয়ে চেয়ার বা আসবাব তৈরি করে মানুষ ব্যবহার করবে; কিন্তু সময়ই তাঁর ভাবনাকে সত্য প্রমাণ করে। পরে সেই পথ অনুসরণ করে রাজশাহীর অন্য ব্যবসায়ীরাও একই কাজ শুরু করেন। তবে সময় বদলেছে। প্লাস্টিক, স্টিল ও আধুনিক আসবাবের দাপটে কমেছে বেতের চাহিদা। তবু প্রতিদিন দোকানে বসেন ফরিদুর রহমান। বয়সের ভারে আর নিজে কাজ করতে পারেন না, তবে কারিগরদের কাজ দেখেন, পরামর্শ দেন। তাঁর কণ্ঠে আক্ষেপও আছে—নিজের ছেলেরা কেউ এই পেশাকে এগিয়ে নিতে চাননি। তাঁর আক্ষেপ, সন্তানেরা ব্যবসার দায়িত্ব নেওয়ার চেয়ে দোকানের মালিকানা নিয়েই বেশি আগ্রহী। তিনি বলেন, দায়িত্ব না নিয়ে শুধু দোকান হাতে নিলে এই ব্যবসা টিকবে না। তাই এখনো পুরোপুরি দোকান তাঁদের হাতে তুলে দেননি। ফরিদুর রহমান বলেন, তাঁর পর হয়তো এই দোকানের দরজা একদিন বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ, একটি শিল্প শুধু কারিগরের হাতে বাঁচে না; প্রয়োজন উত্তরসূরি, দায়িত্ববোধ আর ভালোবাসা। তাঁর সমসাময়িকরা সবাই চলে গেছেন। তিনি একাই বসে আছেন পুরোনো দোকানের সামনে—বেতের স্মৃতি পাহারা দিয়ে।বেতপট্টির ব্যবসায়ীরা বলেন, বেত শিল্প টেকাতে হলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। এছাড়া সহজ শর্তে ঋণ, কারিগরদের প্রশিক্ষণ এবং বাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেওয়া দরকার। হিস্তশিল্প মেলা ও প্রদর্শনীতে হোসনিগঞ্জের বেত পণ্য স্থান পেলে ক্রেতাদের আগ্রহ আবার বাড়তে পারে।
আপনার জেলার সংবাদ পড়তে