পাহাড় ধসে শিশুর মৃত্যু, জঙ্গল সলিমপুরে উদ্ধার তৎপরতায় ইউএনও

এফএনএস (জহিরুল ইসলাম; সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম) : | প্রকাশ: ৯ জুলাই, ২০২৬, ১১:৩৭ এএম
পাহাড় ধসে শিশুর মৃত্যু, জঙ্গল সলিমপুরে উদ্ধার তৎপরতায় ইউএনও

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে আবারও পাহাড়ধসের শিকার হলো চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড। উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পাহাড়ের মাটি ধসে একটি বসতঘর চাপা পড়ে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই দুর্ঘটনার পর পাহাড়ঘেঁষা বসতিগুলোতে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সম্ভাব্য আরও দুর্ঘটনা এড়াতে সকাল থেকেই মাঠে নেমেছে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় চলছে জরুরি মাইকিং, বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার অনুরোধ করা হচ্ছে। প্রশাসনের ভাষ্য, ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় যেকোনো সময় আরও পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়েক দিনের অবিরাম বৃষ্টিতে জঙ্গল সলিমপুর এলাকার পাহাড়ের মাটি অত্যন্ত নরম হয়ে পড়ে। শনিবার সকালে হঠাৎ পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পাদদেশে অবস্থিত একটি বসতঘরের ওপর আছড়ে পড়ে। এ সময় ঘরের ভেতরে থাকা শিশু আশরাফুল ইসলাম তানভীর মাটিচাপা পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দারা তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে তাকে বের করে আনলেও ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দুর্ঘটনার পর অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে যেতে শুরু করেছে। বিশেষ করে পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোর মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সীতাকুণ্ড থানার ওসি (তদন্ত) মো. আলমগীর হোসেন বলেন, পাহাড়ধসে একটি ঘরের ওপর মাটি ভেঙে পড়ে। এতে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে টানা বর্ষণে বারৈয়াঢালা, নামার বাজারসহ বিভিন্ন নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অনেক জায়গায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে মানুষের নিরাপত্তায় পুলিশের টহল অব্যাহত রয়েছে। ফৌজদারহাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সোহেল রানা বলেন, আমরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করছি। নতুন করে যাতে কোনো প্রাণহানি না ঘটে, সে জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় অনবরত মাইকিং করা হচ্ছে। বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যেতে পুলিশ, প্রশাসন ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা একযোগে কাজ করছেন। দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সকাল থেকেই জঙ্গল সলিমপুরসহ বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফখরুল ইসলাম। তিনি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোকে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম বলেন, সীতাকুণ্ডে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে, ছোট কুমিরা ও বাঁশবাড়িয়া এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের এবং জঙ্গল সলিমপুরসহ উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। মাইকিং অব্যাহত রয়েছে। মানুষের জীবন রক্ষাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরো জানিয়েছেন, এসএম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও এসএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বেশ কয়েকটি পরিবার সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, শিশু খাদ্য ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। স্থানীয় সর্দার, মাতব্বর ও স্বেচ্ছাসেবকেরা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে দুর্গত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সহায়তা করছেন। পাশাপাশি পাহাড়ের পাদদেশে নতুন করে কেউ যাতে অবস্থান না নেয়, সে বিষয়েও সতর্ক করা হচ্ছে। দুর্যোগ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি পানিতে সম্পৃক্ত হয়ে স্থিতিশীলতা হারিয়ে ফেলে। এ অবস্থায় পাহাড়ের ঢাল কিংবা পাদদেশে বসবাস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই আবহাওয়ার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুম এলেই পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দিলেও অনেক পরিবার জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়েই পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করে। বিকল্প আবাসনের অভাবও এ সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। তাদের দাবি, শুধু দুর্যোগের সময় উদ্ধার অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ পুনর্বাসনের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। প্রশাসন জানিয়েছে, আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান, নজরদারি ও মাইকিং কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে পাহাড়ের পাদদেশ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার জন্য পুনরায় আহ্বান জানানো হয়েছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে