জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার বড়াইল ইউনিয়নের বেলগাড়ী গ্রামে জমিজমা সংক্রান্ত পারিবারিক বিবাদের জেরে নিজের ভাই, ভাতিজা, স্ত্রী ও পুত্রদের মধ্যে সংঘটিত মারামারির ঘটনায় নিরপরাধ প্রতিবেশীদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলায় জড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার সাথে কোনো প্রকার সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও পুলিশি তদন্ত ছাড়াই প্রতিবেশী রইচ উদ্দিনের ছেলে রেজাউল ইসলাম (৬০) ও তার তরুণ পুত্র মামুন (১৯)-কে গ্রেফতার করায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার বেলগাড়ী গ্রামের আহত জুয়েল ফকিরসহ তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা মিলে একই গ্রামের হাফিজার ফকিরের ছেলে ফজলু ফকিরকে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধে হত্যার হুমকি প্রদান করেন। এঘটনায় ফজলু ফকির গত ২৫ মার্চ ২০২৫ ইং তারিখে তাদের নামে ক্ষেতলাল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। মূলত জমিজমা সংক্রান্ত পূর্ব বিরোধের জেরে দীর্ঘদিন ধরে এই পরিবারের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও উত্তেজনা চলছিল। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৫ জুলাই রাত সাড়ে ৮টায় উভয় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী মারামারি ও জখমের ঘটনা ঘটে। এতে জুয়েলসহ ওই পরিবারের ৪ জন সদস্য গুরুতর আহত হন। এঘটনায় ৭ জনকে আসামি করে জুয়েল ফকির বাদী হয়ে ক্ষেতলাল থানায় এজাহার দাখিল করেন।
তবে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। দুই পরিবারের টাকা-পয়সা ও জমি সংক্রান্ত মারামারির ঘটনার সুযোগ নিয়ে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে প্রতিবেশী রইচ উদ্দিনের ছেলে শাজাহান (৪৮), রেজাউল ইসলাম (৬০) এবং রেজাউলের ছেলে মামুন (১৯)-কে এ মামলায় আসামি করা হয়েছে। সরেজমিনে ওই গ্রামে গিয়ে ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা বাদী জুয়েল ফকিরের আপন ভগ্নিপতি বছির উদ্দিন ও স্থানীয় বাসিন্দা আরমান আলীর ছেলে বিপ্লবের সাথে কথা বললে তারা জানান, ঘটনার সময় অভিযুক্ত শাজাহান, রেজাউল ও তার ছেলে মামুন মারামারির স্থানে উপস্থিতই ছিলেন না। মারামারির সাথে তাদের কোনো দূরতম সম্পর্কও ছিল না। অথচ ক্ষেতলাল থানা পুলিশ কোনো প্রকার প্রাথমিক তদন্ত বা সত্যতা যাচাই ছাড়াই এজাহারনামীয় আসামি হিসেবে রেজাউল ও তার ছেলে মামুনকে গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরণ করে।
এদিকে আহত গোফ্ফার ঘটনার দিন ক্ষেতলাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ১০টায় সাংবাদিকদের বলেন, বেলগাড়ী গ্রামের হাফিজের ছেলে ফজলু ফকিরের স্ত্রী সুফিয়া বেগম ও ছেলে শুভ এবং হাফিজার ফকির দেশীয় অস্ত্র দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে আমাদেরকে মারধর করেছে। অথচ এজাহারে তার প্রতিবেশী রইচ উদ্দিনের ছেলে শাজাহান (৪৮), রেজাউল ইসলাম (৬০) এবং রেজাউলের ছেলে মামুন (১৯)-কে এ মামলায় আসামি করা হয়েছে। অন্যদিকে ফজলু ফকিরের মা ফরিদা বেগম বলেন, মারামারির পর তাদের বাড়িতেও হামলার ঘটনা ঘটে। আজিজার ও গোলজারসহ কয়েকজন তাদের বাড়ির গেট ও জানালা ভাঙচুর করে, পল্লী বিদ্যুতের মিটার ক্ষতিগ্রস্ত করে, সাবল দিয়ে জানালা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে আসবাবপত্র তছনছ করে এবং গরু বিক্রির নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, আমরা ট্রিপল নাইনে ফোন করে পুলিশের কাছে সাহায্য চেয়েছিলাম।
এলাকাবাসীর দাবি, পারিবারিক জমি সংক্রান্ত এই বিরোধ একান্তই হাফিজার ফকির ও জুয়েল ফকিরদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। প্রতিবেশী শাজাহান, রেজাউল কিংবা মামুনের সাথে এই মারামারির কোনো সম্পর্ক নেই। পূর্বশত্রুতার জেরে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল ও সামাজিকভাবে হেনস্তা করতেই অত্যন্ত সুকৌশলে এজাহারে তাদের নাম ঢ়ুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। তদন্ত ছাড়াই পুলিশি ধরপাকড়ে একটি নিরপরাধ পরিবার এখন চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য সেকেন্দার ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পারিবারিক মারামারির মামলায় নিরপরাধ প্রতিবেশীদের জড়িয়ে দেওয়া এবং তদন্ত ছাড়া তাদের গ্রেফতার করা অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে প্রকৃত অপরাধ আড়াল হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষ আইনি হয়রানির শিকার হয়। ক্ষেতলাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোক্তাদুল আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বাদীপক্ষের লিখিত এজাহারের প্রেক্ষিতে এবং প্রাথমিক অভিযোগের ভিত্তিতে মামলাটি রুজু করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত আসামি হওয়ায় দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে আমরা অত্যন্ত সতর্ক আছি। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে প্রতিবেশীদের সম্পৃক্ততা না পাওয়া গেলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া হবে।