পাসওয়ার্ডে বন্দি কুড়িগ্রামের স্বাস্থ্য সেবা, কপাল খুলেছে সংশ্লিষ্টদের

এফএনএস (প্রহলাদ মণ্ডল সৈকত; রাজারহাট, কুড়িগ্রাম) : | প্রকাশ: ১ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:১০ পিএম
পাসওয়ার্ডে বন্দি কুড়িগ্রামের স্বাস্থ্য সেবা, কপাল খুলেছে সংশ্লিষ্টদের

"পাসওয়ার্ড বন্দি কুড়িগ্রামের স্বাস্থ্য সেবা! সাধারণ মানুষ সেবা বঞ্চিত হলেও পাসওয়ার্ডের কারণে কপাল খুলেছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। অব্যবহৃত চিকিৎসা সরঞ্জামাদিকে ব্যবহৃত দেখিয়ে তোলা হয়েছে কোটি কোটি টাকা এবং বাকি বিল উত্তোলনের জন্য চলছে তদবির।

সরেজমিনে দেখা যায়, উত্তরের দারিদ্র পীড়িত জেলার সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে কুড়িগ্রাম ২৫০শয্যা বিশিষ্ট আধুনিক জেনারেল হাসপাতালে  নির্মাণ করা হয়। ক্রয় করা হয় আধুনিক যন্ত্রপাতি। প্রায় ৬/৭বছর ধরে কোটি কোটি টাকা মূল্যের এসব ভারী চিকিৎসা সরঞ্জামাদি অবহেলায় অযন্তে ধুলোর আস্তরণ পড়ে আছে। এরমধ্যে অপারেশন থিয়েটার, ইটিটি-ইকো মেশিন, পোর্টাবল এক্স-রে মেশিন,এনডোজকপি মেশিন, ডায়াথার্মি মেশিন,ইনফিউশন পাম্প,সিরিঞ্জ ডেফিব্রিলেটর, পাম্প, পালস অক্সিমিটার, মেজর অর্থোপেডিক সেট,আর্থোস্কোপ, ডোপলার হার্ট ডিটেক্টর। কোটি কোটি টাকার এসব যন্ত্রপাতি পাসওয়ার্ড জটিলতায় চালু করতে না পারায় দারিদ্রপীড়িত এই অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসা ভোগান্তি কমছে না।

অনুসন্ধানে দেখাযায়,স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে ২০১৮-১৯অর্থবছরে জনস্বাস্থ্য ও পুস্টি সেক্টর কর্মসূচির আওতায় ৩২কোটি ৯৪ লাখ ৬০হাজার টাকার ১৯৩টি চিকিৎসা সরঞ্জামাদির টেন্ডার দেয়া হয়। এসব সরঞ্জামাদি সরবরাহের কাজ পায় মেসার্স মাইক্রো ট্রেডার্স এবং হারামান এন্টারপ্রাইজ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। কিছু মালামাল চাহিদানুযায়ী পুরাতন ভবনে এবং বাকি সরঞ্জামের নতুন ৮তলা ভবনের অব্যবহৃত ওটি কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন কক্ষে স্থাপন করা হয়েছে। মালামালের মান ও সঠিকতা বুঝে নেয়া হয় ২০১৯সালের ১৯মার্চ সার্ভে কমিটি। এরপর জনস্বাস্থ্য ও পুস্টি সেক্টর কর্মসূচির হসপিটাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্ট অপারেশ প্লান হতে ১২ কোটি বরাদ্দ পায়। সেখান থেকে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে ১৭২টি সরঞ্জামাদির জন্য ১১কোটি ৯৯লক্ষ ৯০হাজার টাকা বিল প্রদান করা হয়। অথচ এসব সরঞ্জামাদি গুলো আজ পর্যন্ত ব্যবহৃত না হলেও ২০২৫সালের ১২জুন তৎকালিন হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা: শহিদুল্লাহ এসব মালামাল সচল ও রোগীদের চিকিৎসা সেবা প্রদানে ব্যবহৃত দেখিয়ে বাকি টাকা পরিশোধের জন্য সুপারিশ করেন। বিল পরিশোধের সুপারিশ পাওয়ার পর ২০২৫সালের ১৯আগষ্ট যাচাই বাছাইয়ের জন্য তিস সদস্যের পরিদর্শণ কমিটি গঠন করা হয়। দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও পরিদর্শণ কমিটির প্রতিবেদন আজও আলোর মুখ দেখেনি। ফলে অর্ধ যুগ ধরে মূল্যবান এসব চিকিৎসা সরঞ্জামাদি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকলেও সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবা নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে দুর্নীতির উদ্দেশ্যে এসব মালামালের টেন্ডার করে বিশেষ কৌশলে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডার পাইয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব যন্ত্রপাতির তৎকালিন বাজার মূল্যের চেয়ে ক্রয় মূল্য বেশি দেখিয়ে কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়। এই বিপুল পরিমাণ টাকা পরিশোধের জন্য ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এবং কুড়িগ্রাম হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে বিভাগীয় এবং অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় পর্যন্ত তদবির চলমান রয়েছে।

হাসপাতালে কর্তব্যরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলেন,এসব মালামালের মধ্যে এসি,ফ্রিজসহ কিছু মালামাল চালু থাকলেও ইকো-ইটিটি, পোর্টাবল এক্স-রে মেশিনসহ অনেক মালামাল স্থাপনের পর থেকে চালু করা হয়নি। কিভাবে এসব মেশিন সচল দেখিয়ে বিল উত্তোলন করেছে তা জানা নেই কারোই। তবে সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা উৎকোচের বিনিময়ে এই বিল দিয়েছে এবং বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য তদবির চলমান রেখেছে। তারা আরও বলেন, বেসরকারি ভাবে একটি ইকো করতে এক হাজার থেকে এক হাজার দুই শত টাকা এবং ইটিটি করতে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা ব্যয় হয়। অথচ সরকারি হাসপাতালে উন্নত মানের এসব পরীক্ষা করাতে রোগীর হবে ইকো ২শত এবং ইটিটি পরীক্ষায় ৮শত টাকা ব্যয় হবে। ফলে সাবেক কর্মকর্তাদের নিজস্ব ও শেয়ারকৃত ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক থাকায় এসব মেশিন চালু করা হয়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কুড়িগ্রাম ২৫০শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে তত্বাবধায়ক ডা: নূরে নেওয়াজ আহমেদ স্বীকার করেন,ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান বাকি বিল না পাওয়ায় পাসওয়ার্ড দিচ্ছে না। সাবেক দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে জেলার সাধারণ মানুষ চিকিৎসা সেবা হতে বঞ্চিত হচ্ছে। এখন উর্দ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে দ্রুত এসব অব্যবহৃত চিকিৎসার সরঞ্জামাদি চালুর আশ্বাস দেন তিনি

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে