ভুয়া প্রকল্পে উন্নয়ন

ইউনিয়নেই প্রায় কোটি টাকা হাওয়া কোথাও কাগজের সড়ক

এফএনএস (মোঃ সিদ্দিকুল ইসলাম সিদ্দিক; চিলমারী, কুড়িগ্রাম) : | প্রকাশ: ৯ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৪৫ পিএম
ইউনিয়নেই প্রায় কোটি টাকা হাওয়া কোথাও কাগজের সড়ক

‘কাগজে-কলমে শতভাগ কাজ সম্পন্ন, ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে বরাদ্দের বিলও। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র, কোথাও আগের সিসি ঢালাই রাস্তার ছবি তুলে কাজ চালানো হয়েছে, কোথাও আবার কবরস্থান সংস্কারের সামান্যতম চিহ্নও নেই। শুধু তা-ই নয়, একই সড়কের নাম সামান্য এদিক-ওদিক করে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে দ্বিগুণ বরাদ্দ।’ কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার থানাহাট ইউনিয়নে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্পের (টিআর, কাবিখা ও কাবিটা) আড়ালে এভাবেই কোটি টাকার বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাতের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী প্রতিকার চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। উপজেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চিলমারী উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে টিআর, কাবিখা ও কাবিটার আওতায় ১২৪টি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে কেবল থানাহাট ইউনিয়নেই ৪৪টি প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রায় ৯৩ লাখ টাকা। গ্রামীণ সড়ক, কবরস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয় সংস্কারের কথা বলে এ বিপুল অঙ্কের অর্থ অনুমোদন করা হয়। তবে অভিযোগ উঠেছে, দু’একটি প্রকল্পে নামমাত্র কাজ করে সমুদয় অর্থ পকেটে পুরেছেন সংশ্লিষ্টরা। সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইউনিয়নের বজরা তবকপুর এলাকায় ইউসুফ আলী মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি থেকে কালিরপাঠ মন্দির ৩৯; এবং  ৩৯;ইউসুফ মিলিটারীর বাড়ি থেকে আহম্মেদ আলী মিলিটারীর বাড়ি ৩৯;র একই পথের দুটি স্থানে কায়দা করে নাম বদলে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা করে মোট ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। অথচ বাস্তবে সড়কটিতে কোনো কাজই হয়নি। এ ছাড়া বজরাতবকপুর মজাইডাঙা জামে মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থান সংস্কারে ৫ লাখ ৭০ হাজার ৫২৪ টাকা বরাদ্দ দেখানো হলেও সেখানে কাজের কোনো অস্তিত্ব নেই। একই এলাকার আজমের বাড়ি হতে আইয়ুবের বাড়ি মুখি রাস্তা সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য ৫ মেট্রিকটন গম বরাদ্দ দেয়া হলেও আগের করা সিসি ঢালাইকে নতুন কাজ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এলাকাবাসী কৃঞ চন্দ্র, হরিশ চন্দ্র, বজলার রহমান ও তানিয়া খাতুনসহ অনেকে জানান,‘বর্ষা আসলে রাস্তাটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। অথচ একই রাস্তায় দুটি প্রকল্প দেয়া হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। এলাকাবাসীর দূর্ভোগ লাগবে রাস্তাটি সংস্কারের দাবি জানান তারা। ওই এলাকায় বাকি প্রকল্পগুলিরও একই অবস্থা দেখা গেছে। ইউনিয়নটির ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মাচাবান্দা এলাকায় ‘মেইন রাস্তা থেকে প্রিন্সের বাড়ি’ পর্যন্ত ২ লাখ ২৪ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে সেই রাস্তার কোনো চিহ্নই নেই। সেখানে যাতায়াতের জন্য মানুষ অন্যের উঠান ব্যবহার করছে। একই ওয়ার্ডের প্রমানিক পাড়ায় পুকুরপাড়ে গাইড ওয়াল নির্মাণের জন্য ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও পুকুরে শুধু পুরানো ডেউটিন ও বাঁশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, ফেলা হয়নি কোনো মাটি। তবে সড়কে নামমাত্র কয়েকগাড়ি মাটিফেলা হয়। মাচাবান্দা কালামের চাতাল মেইন রোড হতে ডিপঘর পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার ও উন্নয়ন বরাদ্দ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দেয়া হলেও স্থানীয় হামিদুল ইসলাম ও জয়নাল হক জানান, পূর্ববর্তি ইউপি সদস্যের আমলে মাটি কাটা হলেও বেহাল সড়কটিতে আর উন্নয়ন হয়নি। একই ওয়ার্ডের অন্যান্য প্রকল্পের অবস্থাও এক।অন্যদিকে, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ছোট কুষ্টারী এলাকায় আব্দুল বারী সরকারের বাড়ি থেকে উমর হাজির বাড়ি পর্যন্ত সড়ক সংস্কারে ৩ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে আগে থেকেই এইচবিবি প্রকল্পের কাজ চলমান থাকলেও একই স্থানকে কাবিটা প্রকল্প দেখিয়ে বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। এছাড়া মণ্ডলপাড়া পাকা রাস্তা থেকে আব্দুল কাইয়ুমের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে ২ লাখ ৯ হাজার ১০০ টাকা এবং একই সড়ককে ভিন্ন নামে দেখিয়ে আরও ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও স্থানীয়দের দাবি, সড়কটি আগে থেকেই সিসি ঢালাই থাকায় নতুন কোনো কাজ হয়নি। একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে ২ নম্বর ওয়ার্ডের কিসামতবানু এলাকাসহ উপজেলার অন্যান্য প্রকল্পেও। এদিকে প্রকল্পের নাম ও সভাপতিদের তালিকা চাওয়া হলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়ের কর্মচারীরা জানান, কর্মকর্তা সোহেল রহমানের অনুমতি ছাড়া তা দেওয়া সম্ভব নয়। অথচ অভিযোগ রয়েছে, এই কর্মকর্তা গত এক মাস ধরে কার্যালয়ে অনুপস্থিত। এমনকি তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোনটিও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন,‘এ ধরণের ঘটনা ঘটে থাকলে অবশ্যই যাচাই-বাচাই করে দেখবো। জেলা  ত্রাণ ও পূনর্বাসন কর্মকর্তা এ টি এম বেনজীর রহমান বলেন,‘আমি ফিল্ডে আছি অফিসে ফিরে বিস্তারিত তথ্য জেনে আপনাকে জানাবো।’

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে