বাংলাদেশ রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ শহর সৈয়দপুর। এখানে রয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ রেলওয়ে কারখানা ও বিপুলসংখ্যক রেল কর্মকর্তা-কর্মচারীর বসবাস। অথচ রেলওয়ের কর্মী ও তাদের পরিবারের চিকিৎসাসেবার জন্য প্রতিষ্ঠিত সৈয়দপুর রেলওয়ে হাসপাতালটি এখন কার্যত রোগীশূন্য ও চিকিৎসক সংকটে ধুঁকছে।
পার্থ সারতী বণিক নামে একজন ডিভিশনাল মেডিকেল অফিসার দিয়ে চলছে হাসপাতালটি। ওই চিকিৎসককে আবার একসঙ্গে লালমনির হাট,পার্বতীপুর ও সৈয়দপুর রেলওয়ে হাসপাতালের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে বলে জানা গেছে। ফলে বিশাল অবকাঠামো থাকলেও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় সৈয়দপুর রেলওয়ে হাসপাতাল ছিল রেলওয়ে কর্মীদের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল। বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগে নিয়মিত রোগীর চাপ থাকত। কিন্তু ধীরে ধীরে চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ানসহ প্রয়োজনীয় জনবল কমতে থাকায় হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা সংকুচিত হয়ে পড়ে। বর্তমানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় রোগীরাও এ হাসপাতাল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-একজন চিকিৎসককে একাধিক রেলওয়ে হাসপাতালের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। এতে একটি হাসপাতালেও নিয়মিত চিকিৎসক উপস্থিতি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য জনবলের ঘাটতিও রয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের চিকিৎসাসেবা নিয়ে অতীতেও চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল সংকটের কথা উঠে এসেছে। ২০১২ সালের এক প্রতিবেদনে সৈয়দপুর রেলওয়ে হাসপাতালকে চিকিৎসক, নার্স ও চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকটে সেবা দিতে হিমশিম খেতে দেখা যায়।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (চচচ) কর্তৃপক্ষের প্রকল্প তথ্যে আরও বলা হয়েছে, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল এবং রোগ নির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের অভাবে সৈয়দপুরের বিভাগীয় রেলওয়ে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। একই সঙ্গে হাসপাতালটির পাশে থাকা অব্যবহৃত জায়গা কাজে লাগিয়ে আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, রেলওয়ের হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবা আধুনিকায়নে ২০২৫ সালে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই বছরের এপ্রিলে রেলওয়ে ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং পরে ঢাকা, রাজশাহী ও সৈয়দপুর রেলওয়ে হাসপাতালকে যৌথ ব্যবস্থাপনায় আনার সিদ্ধান্ত হয়। পরিকল্পনা ছিল এসব হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্যও উন্মুক্ত করা।
কিন্তু সিদ্ধান্তের পরও সৈয়দপুর রেলওয়ে হাসপাতালের বাস্তব চিত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো ও মূল্যবান স্থাপনা পড়ে থাকলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও জনবল না থাকায় এর সুফল মিলছে না। ফলে একদিকে রেলওয়ের কর্মীদের চিকিৎসার জন্য বাইরে ছুটতে হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি সম্পদেরও কাঙ্ক্ষিত ব্যবহার হচ্ছে না। রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, হাসপাতালটি সচল করতে হলে দ্রুত পর্যাপ্তসংখ্যক চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও সহায়ক জনবল নিয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে। একই সঙ্গে একজন চিকিৎসকের ওপর একাধিক হাসপাতালের দায়িত্ব না দিয়ে প্রতিটি হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসক উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সৈয়দপুর রেলওয়ে হাসপাতালটি শুধু একটি পরিত্যক্তপ্রায় ভবন নয়; এটি রেলওয়ের হাজারো কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তাই দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে বড় অঙ্কের সরকারি বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এই হাসপাতালটি ধীরে ধীরে অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এখন প্রশ্ন-তিন হাসপাতালের দায়িত্বে একজন চিকিৎসক রেখে সৈয়দপুর রেলওয়ে হাসপাতালকে আর কতদিন এভাবে ফেলে রাখা হবে। ৯ আগস্ট সৈয়দপুর রেলওয়ে হাসপাতালে গেলে চোখে পড়ে ভুতুরে দৃশ্যগুলো। ইনডোরের এক পাশে পড়ে আছে শুধু রোগি থাকার সিট। এক ফাকা দৃশ্য। অপরপাশে রয়েছে ৮ জন রোগি।
চিকিৎসক নেই,আউট ডোরে ভেতরে ফ্যান চলছে কিন্তু বাইরে তালাবদ্ধ কক্ষগুলো। কিছু সময় অপেক্ষার পর কোথা থেকে এলেন দুইজন। একজন রেজাউল হক। তিনি ড্রেসিং করেন। সাংবাদিক প্রশ্ন করলে জবাব দিলেন,ডাঃ আছে মাত্র একজন,তিনিও অনুপস্থিত। তিনিও স্বীকার করলেন এভাবে একটি সরকারি হাসপাতাল চলে না। সরকারের নজর দেয়া প্রয়োজন বলে জানালেন।