জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বিনিয়োগবান্ধব নীতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেছেন, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিক্রির ক্ষেত্রেও যোগ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আরও সুযোগ দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ আয়োজিত ‘জ্বালানি খাতের সংকট: সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন তিনি। সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত উপস্থিত ছিলেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন।
মন্ত্রী বলেন, সরকার বেসরকারি বিনিয়োগবান্ধব। বিশেষ করে এনার্জি সেক্টরে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীও বেসরকারি খাতের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করছেন এবং তিনিও তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার পাশাপাশি শিল্পায়ন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ব্যবসার জন্য নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। ব্যবসা সহজ করার জন্য অতীতে তৈরি হওয়া বিভিন্ন জটিলতা ও অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি তেলে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ
সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল, সেটিকে বেসরকারি খাতকে আরও সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয়তার একটি কারণ হিসেবে তুলে ধরেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও আতঙ্কে দেশের বিভিন্ন পেট্রল পাম্পে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছিল। পরে কালোবাজারি এবং অনলাইনেও বেশি দামে জ্বালানি তেল বিক্রির চেষ্টা দেখা যায়।
এ পরিস্থিতির পর প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি জানিয়ে জ্বালানি তেলের ব্যবসায় বেসরকারি খাতকে আরও সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও জ্বালানি তেল আমদানি ও বিক্রি করতে পারলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও শক্তিশালী হবে। ভারতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে ইন্ডিয়ান অয়েলের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও জ্বালানি ব্যবসায় রয়েছে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়ার জন্য এই নীতি করা হচ্ছে না বলে স্পষ্ট করেন তিনি। যোগ্য সব প্রতিষ্ঠানের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য একটি সাধারণ নীতিমালা তৈরির কথা জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, “একটা নির্দিষ্ট কোম্পানিকে দেওয়ার জন্য আমরা এটা করছি, এমন ধারণা ঠিক নয়।” বরং যে প্রতিষ্ঠানগুলো যোগ্য, তাদের জন্য সুযোগ তৈরির লক্ষ্যেই নীতিমালা করা হবে।
মন্ত্রী আরও জানান, সরকার ইতিমধ্যে বেসরকারি খাত থেকে কিছু ধরনের জ্বালানি তেল কিনছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জ্বালানি তেলের বাজারে বেসরকারি অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
দেশের বর্তমান গ্যাস সংকট নিয়েও কথা বলেন জ্বালানিমন্ত্রী। তিনি জানান, একটি এফএসআরইউ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সারা দেশে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শিল্পমালিকদের সঙ্গে বসে সংকটের সমাধান নিয়ে আলোচনা করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, “আমাদের দেশের শিল্পমালিকরা যেন বিপদে না পড়েন, সেদিকে আমরা খেয়াল রাখছি।”
এলএনজি অবকাঠামোর কোনো একটি স্থাপনায় দুর্ঘটনা বা কারিগরি সমস্যার কারণে যাতে সারা দেশের শিল্পকারখানায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সে বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। এলএনজি সরবরাহে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় বিকল্প ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় সময় নির্ধারণ নিয়েও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, শিল্পোদ্যোক্তা, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের পথ খোঁজা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন বলেও জানান তিনি। জ্বালানি খাতের সংকট ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর আরও আলোচনা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সতর্কতা
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রেও সতর্কভাবে এগোনোর কথা বলেছেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
তিনি বলেন, এসব প্রকল্পের কারণে অনেক ক্ষেত্রে অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেছে। উন্নত দেশগুলোতেও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে আপত্তি বা সংরক্ষণশীলতা রয়েছে। তাই নতুন প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে খুব সতর্ক থাকতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, “আমাদেরকে খুব সতর্কতার সঙ্গে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয়ে আগাতে হবে।”
সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে সরকার তুলনামূলকভাবে আগ্রাসী পরিকল্পনা নিয়েছে বলে জানান জ্বালানিমন্ত্রী। তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎকে ব্যবসাবান্ধব করতে দুই মাসের মধ্যে নতুন নীতি তৈরি করা হয়েছে। ওই নীতিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে, যার মধ্যে পাঁচ বছরের কর অবকাশও রয়েছে।
নীতিতে যেসব সুবিধার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানান তিনি।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ওপেক্স মডেলকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা শহর থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা হবে।
ঢাকা সিটি করপোরেশনের দুই প্রশাসনের সঙ্গে এ বিষয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। এলাকাভিত্তিক জায়গা নির্ধারণ করে বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পর বিনিয়োগকারীরা বিদ্যুৎ সরবরাহ করে গ্রাহকের কাছ থেকে বিল আদায় করতে পারবেন। ফলে পুরো ব্যবস্থার জন্য সরকারের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে না।
বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে সরকারি জমিকে বিনিয়োগের অংশীদার করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। সরকারের দেওয়া জমির মূল্য প্রকল্পে সরকারের শেয়ার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে বলে মনে করেন মন্ত্রী।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের লক্ষ্য ১০ হাজার মেগাওয়াট। এই লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব বলেও আশাবাদ প্রকাশ করেন তিনি।
জ্বালানি সংকটকে কেন্দ্র করে কেউ যাতে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা না করে, সে বিষয়ে সতর্ক করেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, “দেশের ক্রাইসিস মোমেন্টে অনেকে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে। দেশের ক্রাইসিস বাড়িয়ে দিয়ে আপনারা কিছু হাসিল করতে পারবেন না।”
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি খাত নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি না করে দেশের স্বার্থে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বেসরকারি খাত থেকে কোনো বিনিয়োগ প্রস্তাব এলে সেটি আকর্ষণীয় এবং শিল্পের জন্য সহায়ক হলে দ্রুত অনুমোদনের আশ্বাসও দিয়েছেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
তিনি বলেন, “প্রপোজাল যদি অ্যাট্রাক্টিভ হয় এবং আমার ইন্ডাস্ট্রির জন্য হেল্পফুল হয়, অবশ্যই আমরা কোনো সময় নষ্ট করব না।”
মন্ত্রী জানান, প্রস্তাব পাওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা ও যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হবে। তার ভাষায়, কোনো খাতের উন্নয়ন একা করা সম্ভব নয়, সবাইকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে হবে।
সেমিনারে বক্তারা জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বিনিয়োগের সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করেন।