সোনালি আঁশ দিয়ে ব্যাংকিং পাট মন্ত্রণালয়ের প্রশংসা

এফএনএস (আদিল উদ্দিন আহমেদ; ভৈরব, কিশোরগঞ্জ) : | প্রকাশ: ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:২১ পিএম
সোনালি আঁশ দিয়ে ব্যাংকিং পাট মন্ত্রণালয়ের প্রশংসা

ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টার এক চেনা দৃশ্য। গ্রাহক টাকা তুলছেন বা জমা দিচ্ছেন, আর তার হাতে উঠে আসছে একটি কাগজের খাম কিংবা পলিথিনের ব্যাগ। কয়েক মুহূর্তের ব্যবহার শেষে যার ঠিকানা হয় ডাস্টবিন কিংবা নর্দমায়। এই চিরচেনা ছবিটাই এবার বদলে দিয়েছে এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসির ভৈরব শাখা।

চলতি আগস্ট মাস থেকে শাখাটি নগদ টাকা লেনদেনের জন্য কাগজের খাম বা পলিথিনের ব্যাগের বদলে গ্রাহকদের হাতে তুলে দিচ্ছে দেশীয় পাট ও কাপড়ে তৈরি নান্দনিক, টেকসই ও পুনঃব্যবহারযোগ্য ব্যাগ। ছোট্ট এই পরিবর্তনই যেন হয়ে উঠেছে প্রথাগত ব্যাংকিংয়ের গণ্ডি ভেঙে পরিবেশ সুরক্ষায় এক দায়িত্বশীল দৃষ্টান্ত।

পাটের তৈরি ব্যাগের এই ব্যবহার শুধু একটি অভ্যাস বদল নয় এটি এক নতুন দিগন্তের সূচনা, যেখানে প্রতিটি লেনদেনের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে পরিবেশ রক্ষার একটি গভীর অঙ্গীকার।

শাখা প্রধান রকিবুল হাসানের কণ্ঠে ফুটে ওঠে এই উদ্যোগের পেছনের ভাবনা। তিনি বলেন আমরা চেয়েছিলাম লেনদেনের প্রথাগত খোলস ছাড়িয়ে গ্রাহকের হাতে এমন কিছু তুলে দিতে, যা পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দেবে।

ক্যাশ কাউন্টারে লেনদেন শেষে যখন গ্রাহকের হাতে তুলে দেওয়া হয় মসৃণ, সুদৃশ্য পাট ও কাপড়ের ব্যাগ, তখন সেখানে তৈরি হয় এক অন্যরকম মুহূর্ত—যা নিছক আর্থিক লেনদেনের সীমানা পেরিয়ে হয়ে ওঠে এক দারুণ অভিজ্ঞতা।

এ দিকে শাখা প্রধান রকিবুল হাসান  জানান,  বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসির ভৈরব শাখার পরিবেশবান্ধব একটি উদ্যোগকে “অনন্য ও অনুকরণীয়” বলে অভিহিত করেছেন। নগদ ক্যাশ পরিবহনে পলিথিন ও কাগজের ব্যবহার কমিয়ে শাখা কর্তৃক পাট ও কাপড়ের পুনঃব্যবহারযোগ্য ব্যাগ চালুর উদ্যোগ ইতোমধ্যেই ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমাদের ঐতিহ্যবাহী সোনালি আঁশ পাটকে দৈনন্দিন ব্যবহারে ফিরিয়ে আনার এটি একটি অনন্য প্রয়াস। পরিবেশ সুরক্ষা এবং পাটের বহুমাত্রিক ব্যবহার বৃদ্ধিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমন দায়িত্বশীল ভূমিকা সত্যিই অনুকরণীয়।”

তিনি দেশের অন্যান্য ব্যাংক ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানকে এই গ্রিন ব্যাংকিং মডেল অনুসরণের আহ্বান জানান।

জানা গেছে, চলতি আগস্ট মাস থেকে এনআরবিসি ব্যাংক ভৈরব শাখায় নগদ টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে কাগজের খাম বা পলিথিনের ব্যাগের পরিবর্তে দেশীয় পাট ও কাপড়ের তৈরি পুনঃব্যবহারযোগ্য ব্যাগ গ্রাহকদের মাঝে বিতরণ শুরু করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব এই উদ্যোগটি দ্রুতই গ্রাহকদের মাঝে সাড়া ফেলে এবং স্থানীয় পর্যায় ছাড়িয়ে বৃহত্তর মহলে প্রশংসিত হয়।

উদ্যোগটির বিষয়টি জানতে পেরে ভৈরব-কুলিয়ারচরের স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম শাখার সাথে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং এ উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

এমনই একজন গ্রাহক মেহেদী পারভেজ। টাকা হাতে পেয়ে তিনি জানান, এতদিন টাকা লেনদেনে কাগজের খাম বা পলিথিনের থলেতেই অভ্যস্ত ছিলেন তারা, যা সামান্য ব্যবহারের পরই জায়গা পেত ডাস্টবিনে। কিন্তু এখন এনআরবিসি ব্যাংকের হাত থেকে পাওয়া পাটের ব্যাগটি তার কাছে মনে হয়েছে একইসঙ্গে মার্জিত, টেকসই ও ঐতিহ্যবাহী। ব্যাংকে এসে এমন এক অনন্য অনুভূতি ও সম্মানের মুখোমুখি হবেন, সেটা ভাবনাতেও ছিল না। যত্ন করে বারবার ব্যাগটি ব্যবহার করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, পরিবেশের প্রতি যত্নশীল এই সংস্কৃতি তার মন ছুঁয়ে গেছে।

আগস্ট মাসে শুরু হওয়া এই ক্ষুদ্র পদক্ষেপটি ইতিমধ্যে পুরো এলাকায় পরিবেশবান্ধব ও টেকসই অভ্যাসের ভাবনাতে সাড়া জাগিয়েছে।  উদ্যোগের মূল লক্ষ্য দুটি—একদিকে পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব কমানো, অন্যদিকে গ্রাহকদের মধ্যে পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গড়ে তোলা।

এই উদ্যোগ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসির সিলেট জোনের জোনাল হেড ও ভাইস প্রেসিডেন্ট মোঃ আরিফুর রহমান। তিনি বলেন, ব্যাংকিং মানেই কেবল আর্থিক লেনদেন নয়; একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সমাজ ও পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা পালন করাও আমাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। প্রতিটি গ্রাহকের হাতে যখন একটি পাটের ব্যাগ পৌঁছে যায়, তখন সেটি কেবল একটি উপহার থাকে না—তা হয়ে ওঠে পরিবেশ সচেতনতার একটি বার্তাবাহক। এই ছোট ছোট পদক্ষেপই একসময় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে রূপ নেবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

স্থানীয়দের চোখে, পাটের এই সাধারণ ব্যাগটি এখন আর কেবল টাকা বহনের একটি পাত্র নয়। এটি পরিণত হয়েছে দায়িত্বশীল কর্পোরেট আচরণের প্রতীকে, প্লাস্টিদূষণ রোধের এক বাস্তব উদাহরণে, এবং একসময় বাংলাদেশের অর্থনীতির অহংকার হয়ে থাকা দেশীয় সোনালি আঁশের গৌরব পুনরুদ্ধারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে।

ভৈরবের একটি ছোট শাখা থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা প্রমাণ করে দেয় পরিবর্তনের জন্য বড় বাজেট বা জাঁকজমকপূর্ণ ঘোষণার প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় শুধু সদিচ্ছার, আর একটি সাধারণ পাটের ব্যাগেই যে লুকিয়ে থাকতে পারে টেকসই ভবিষ্যতের বার্তা, তা যেন নতুন করে সামনে আনলো এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসির ভৈরব শাখার কর্মকর্তারা।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে