আপিল বিভাগে মামলার স্তূপে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ বাড়ছে। মূলত বিচারপতির সঙ্কটে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মাত্র ৪ জন বিচারপতি রয়েছে। আর মামলা জমেছে প্রায় ৩৯ হাজার। যদিও সাংবিধানিক বা আইনগতভাবে আপিল বিভাগে কতোজন বিচারপতি দায়িত্ব পালন করবেন সে ব্যাপারে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ইতিপূর্বে আপিল বিভাগে সর্বোচ্চ ১১ জন বিচারপতির দায়িত্ব পালনের নজির রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে বিচারপতির সঙ্কটে একজন বিচারপতির কাঁধে গড়ে সাড়ে ৯ হাজারেরও বেশি মামলার চাপ পড়েছে। আপিল বিভাগের কার্যক্রম এখন একটি বেঞ্চ দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে দীর্ঘসূত্রতায় পড়ছে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক, ফৌজদারি, দেওয়ানি ও রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি। এমন পরিস্থিতি বাড়ছে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ। উচ্চ আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, আপিল বিভাগে বিগত ২০০৯ সালে ১১ জন বিচারপতি ছিলেন। তখন বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিলো ৫ হাজার ২৬০টি। আর ২০১১ সালে ছিলো ১০ জন বিচারপতি আর বিচারাধীন মামলা ছিলো ১২ হাজার ৪৪১টি। ২০১৩ সালে বিচারপতির সংখ্যা ১০ জন থাকলে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়ে ১৪ হাজার ৩৩৮টিতে দাঁড়ায়। ২০১৭ সালে বিচারপতির সংখ্যা ছিল ৯ আর বিচারাধীন মামলা ছিলো ১৬ হাজার ৫৬৫টি। ২০২২ সালে বিচারপতির সংখ্যা ছিল ৯ জন আর বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়ে ১৯ হাজার ৯২৮টিতে দাঁড়ায়। আর ২০২৪ সালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৩১ হাজার ১২০টিতে দাঁড়িয়েছে। এখন ওই সংখ্যা ৩৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
সূত্র জানায়, আপিল বিভাগে বিচারপতির কোনো সংখ্যা সংবিধানে নির্ধারণ করা হয়নি। বিগত ২০০৯ সালে আপিল বিভাগে সর্বোচ্চ ১১ জন বিচারপতি দায়িত্ব পালন করেন। আর বিগত ২০২২ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আপিল বিভাগের ৮ জন বিচারক নিয়েই তিনটি বেঞ্চ পুনর্গঠন করে পরিচালনা করেছিলেন বিচারকাজ। তখন মামলা নিষ্পত্তিতে গতি পেয়েছিল। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত আপিল বিভাগে প্রায় ৩৯ হাজার মামলা বিচারাধীন ছিলো। তার মধ্যে ফৌজদারি মামলা ১৭ হাজার ৬১টি এবং দেওয়ানি মামলা ২১ হাজার ৬৫২টি। ইতিমধ্যে মামলার সংখ্যা আরো বাড়লেও বর্তমানে আপিল বিভাগে মাত্র ৪ জন বিচারপতি দায়িত্ব পালন করছে। ফলে একজন বিচারপতির ওপর চেপেছে গড়ে প্রায় ৯ হাজার ৬৭৮টি মামলা। ৬৭ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ায় সংবিধান অনুযায়ী গত ১৫ জুলাই আপিল বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ বিচারপতি অবসরে গেছেন। তার আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি আরো একজন অবসরে যান। যদিও ২০২৫ সালে দুজন বিচারপতিকে আপিল বিভাগে নিয়োগ দেয়া হয়।
এদিকে আইনজীবীদের পক্ষ থেকে আপিল বিভাগের বিচারক সংখ্যা বাড়ানো এবং বিশেষায়িত বেঞ্চ গঠনের দাবি জানিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে আইন মন্ত্রণালয়ের সচিবের মাধ্যমে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আইনজীবীদের মতে, আপিল বিভাগে একটি মাত্র বেঞ্চ থাকায় গুরুত্বপূর্ণ মামলা দ্রুত শুনানির সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। মামলাজট কমাতে দ্রুত আপিল বিভাগে বিচারপতি নিয়োগ জরুরি। কারণ দীর্ঘদিন ধরে আপিল বিভাগে একটি বেঞ্চ বসছে। অথচ আগে তিনটি বেঞ্চে বিচারকাজ পরিচালিত হতো। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ বাড়ছে এবং চূড়ান্ত বিচার পেতে করতে হচ্ছে দীর্ঘ অপেক্ষা।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক মোহাম্মদ আলী জানান, একটি বেঞ্চ দিয়ে বিপুলসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়। ফলে বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আপিল বিভাগে দ্রুত বিচারপতি নিয়োগ দেয়া জরুরি।