দেশে গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তবে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী পরিস্থিতির আরও উন্নয়নে সময় প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশে আল-কায়েদার তৎপরতা নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদনকে অনুমাননির্ভর উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, সরকার এটি আমলে নিচ্ছে না এবং এমন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কোনো পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে না।
সোমবার (১৭ আগস্ট) সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে ‘বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন, ২০২৫’-এর প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও সুপারিশ প্রণয়ন কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত ছয় মাস বা ১৮০ দিনে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। তবে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও সুসংহত করতে সময় প্রয়োজন। তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসের মধ্যে বিভিন্ন সংস্কার কাজ হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেশ কিছু উদ্যোগও দেখা গেছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রথম ১৮০ দিনে সরকারের নেওয়া ও বাস্তবায়িত বিভিন্ন উদ্যোগ ও কর্মসূচি জনগণের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত রূপরেখার আলোকে এ সময়ে জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সরকারের প্রথম ছয় মাসের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের মধ্যেও সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করেছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও গ্যাস সংকট তৈরি হলেও দেশে তাৎক্ষণিকভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়নি। বোরো মৌসুমে কৃষকদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে প্রায় এক মাস মূল্য বৃদ্ধি স্থগিত রাখার পর সহনীয় মাত্রায় দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
গ্যাস ও জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের এ সমস্যা রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। এ সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং উৎপাদন অব্যাহত রাখতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি মহেশখালীতে আরেকটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপনের জন্য জায়গা নির্ধারণে জরিপ চলছে। সরকার-টু-সরকার ভিত্তিতে দুটি এফএসআরইউ নির্মাণের সিদ্ধান্তও হয়েছে।
বর্তমানে সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটি বা অন্য কোনো সমস্যার কারণে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে। এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলায় নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গ্যাসের আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশের অভ্যন্তরে, পাশাপাশি অফশোর ও অনশোরে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাসের চাহিদা মেটানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় কর্মকর্তা এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের মাসিক সম্মানী দেওয়ার পাশাপাশি ক্রীড়াবিদ ও সংস্কৃতিবিদদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সরকারের নীতি ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে দেশে খাদ্যের একটি মজবুত ও নিরাপদ মজুত গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অর্জনের সমন্বিত বিবরণী শিগগিরই প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং অথবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মাধ্যমে গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হবে বলেও জানান তিনি।
আল-কায়েদা নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদন
বাংলাদেশে আল-কায়েদার তৎপরতা নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন প্রসঙ্গেও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, প্রতিবেদনটি তিনি এখনো পড়েননি। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের মাধ্যমে বিষয়টি জেনেছেন।
সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছে, তা না দেখে বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী সেখানে কিছু পর্যবেক্ষণ বা অনুমানের কথা থাকতে পারে।
সরকার প্রতিবেদনটি আমলে নিচ্ছে কি না জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “আমরা আমলে নিচ্ছি না।” তিনি আরও বলেন, “অনুমাননির্ভর রিপোর্টের ওপর আমরা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছি না।”
মন্ত্রী জানান, তিনি প্রতিবেদনটি নিজে না দেখে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চান না।
এদিকে তাকে মন্ত্রিসভার অন্য কোনো দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে, এমন গুঞ্জন প্রসঙ্গে সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমিও গুঞ্জন শুনছি।”