কুড়িগ্রামে অভিনব কায়দায় একই দাগের জমি জাল দলিলের মাধ্যমে ব্যক্তি ও বিদ্যালয়ের নামে বরাদ্দ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে করে অনিশ্চিয়তায় পরেছে বিদ্যালয়টির জমি ও সরকারি সম্পদের ভবিষ্যত! জমিদাদা গোপনে ছেলের নামে জমির দলিল করার পরও সেই জমির একাংশ পরবর্তীতে আবার বিদ্যালয়ের নামে দানপত্র দলিল করে দিলে জটিলতা সৃষ্টি হয়। বিষয়টি এতদিন গোপন থাকলেও প্রধান শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পর প্রতারণামূলক অনৈতিক এই ঘটনাটি সকলের নজরে আসে। এদিকে উপজেলা প্রশাসন থেকে তদন্ত কমিটি জমির দলিলসমূহের বৈধতা ও স্বত্বের বিষয়ে জটিলতা সমাধানে জমি উদ্ধার ও সরকারি সম্পদ রক্ষায় আইনের আশ্রয় নেয়ার সুপারিশ করেছেন।
সরজমিন কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার দলদলিয়া ইউনিয়নের কল্যাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়টির চারদিকে বাউন্ডারি দিয়ে একতলা পাকা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ৩৩শতক জমির উপর দাঁড়িয়ে থাকা বিদ্যালয়টির শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাকরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। এই স্কুলটি ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৬ সালে জমির মালিক মৃত: আব্দুর রহিম, তার ০.৮৬ শতক জমির মধ্যে প্রথম দফায় স্কুলের নামে ৩৩শতক জমি এবং দ্বিতীয় দফায় ২৩শতক জমিসহ মোট ৫৬শতক জমি মহাপরিচালক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর বরাবর দানপত্র দলিল করে দেন। এ সময়টিতে জমিদাতার ছেলে আবু বক্কর সিদ্দিক স্কুলটিতে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০০০-২০০১ অর্থবছরে ৫৬শতক জমির মধ্যে প্রধান শিক্ষক কৌশলে ৩৩শতক জমির মধ্যে একতলা ভবন ও বাউন্ডারির বরাদ্দ চাইলে সেভাবেই কার্যটি সম্পাদন হয়। ফলে স্কুলের বাউন্ডারির বাইরে ২৩শতক জমি এখন প্রধান শিক্ষক ভোগদখল করছেন। পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিক অবসরে যাওয়ার পর জানা যায়, তার পিতা মৃত: আব্দুর রহিম যে ০.৮৬ শতক জমির মধ্যে ৫৬শতক জমি স্কুলের নামে দলিল করে দিয়েছিলেন, সেই একই জমিটি স্কুলের নামে দলিল করে দেওয়ার পূর্বেই তার সন্তান ও সাবেক প্রধান শিক্ষক আবু বক্করের নামে দলিল করে দেয়া ছিল। বিষয়টি বাবা ও ছেলে অবগত থাকলেও এতদিন সেটা প্রকাশ করা হয়নি। তার অবসরে যাওয়ার পর বিষয়টি ফাঁস করা হলে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। একই জমি অনৈতিকভাবে দুজনের নামে দলিল করার ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।
এছাড়ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিকের নামে বিদ্যালয়ের সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে। অভিযোগকারী দক্ষিণ দলদলিয়া খামার মাগুড়া গ্রামের আতিকুর রহমান মন্টু ফকির বলেন, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিক বিদ্যালয় থেকে অবসরে যাওয়ার সময় বিদ্যালয়ের সম্পদ তছরুপ করেন। তিনি বিদ্যালয়ের একটি স্টিলের আলমারী, একটি লাপটপ, একটি বড় নলকূপ, একটি পানির ট্যাঙ্ক, একটি মটর পাম্প, একটি সাউন্ড বক্স, ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের ড্রেস, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার উপকরণ এবং স্কুলের টিনের চালাটি আত্মসাৎ করেন।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আ, ন, ম বজলুর রশীদ জুয়েল বলেন,আমি দায়িত্ব নেওয়ার সময় যে উপকরণ ও সম্পদ পেয়েছি সেটাই তদন্ত কমিটি ও উর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে জানিয়েছি। এছাড়াও জমি সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি জানান, স্কুলের নামে দু’দফায় যে ৫৬ শতক জমি দলিল করে দেয়া হয়েছে, সেখানে তথ্য গোপন করা হয়েছে। জমিদাতা প্রথমে জমিটি তার পূত্র ও সাবেক অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিকের নামে দলিল করে দেন। পরবর্তীতে ছেলের নামে লিখে দেয়া জমি স্কুলের নামে লিখে দেন। বিষয়টি পিতা ও পূত্র জেনেশুনেই করেছেন মর্মে প্রতিয়মান হয়। বিষয়টি উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের তদন্তাধীন রয়েছে।
কল্যাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক আব্দুল বাতেন শাহ ফকির বলেন, তৎকালিন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিকের কাছে ২৫হাজার টাকা প্রদান সাপেক্ষে ৫৬শতক জমি স্কুলের নামে লিখে দেয়া হয় বলে এই শিক্ষক তদন্ত কমিটির কাছে লিখিত বক্তব্য প্রদান করেন।
বিষয়টি নিয়ে সাবেক অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিক সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কথা বলতে না চাইলেও তিনি জানান, আমার নিজ দলিলমুলে জমিটি রয়েছে। এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটির প্রধান সহকারি কমিশনার (ভূমি)র সাথে কথা হয়েছে। এর বেশি কিছু বলতে পারবো না।
তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটির প্রধান উলিপুর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) এস এম মেহেদী হাসান জানান, রেকর্ড মূলে জমিটি সাবেক অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিকের নামে রয়েছে। তবে ভোগদখলে রয়েছে কল্যাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে। জমিদাতা প্রতারণা করে জমিটি স্কুলের নামে দানপত্র দলিল করে দিয়েছেন। আমরা সাবেক অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু বক্কর সিদ্দিকের সাথে কথা বলেছি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মহোদয়ের কাছে লিখিতভাবে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। উনি বিদ্যালয়ের জমি বিদ্যালয়ের নামে দিতে গড়িমশি করলে জমি উদ্ধারে আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে কর্তৃপক্ষ।