শাহজালালের ইডিকে হুমকি, জামায়াত নেতা আখতারুজ্জামান গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:২১ পিএম
শাহজালালের ইডিকে হুমকি, জামায়াত নেতা আখতারুজ্জামান গ্রেপ্তার
ছবি: সংগৃহীত

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে (ইডি) হুমকি এবং নিরাপত্তা সুপারভাইজারকে মারধরের অভিযোগে করা মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকার নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ডিএমপির ডিবিপ্রধান মো. শফিকুল ইসলাম সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে জানান, বিমানবন্দর থানায় করা মামলায় আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে ওই থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। এর আগে সন্ধ্যা ৬টার দিকে তিনি জানিয়েছিলেন, ডিবি সদস্যরা তাকে হেফাজতে নিয়েছেন। তার বাসায় ডিবির সদস্যরা অবস্থান করছিলেন এবং নামাজ শেষে তিনি তাদের সঙ্গে যাওয়ার কথা ছিল।

পরে পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার রেজাউল করিম রেজা বলেন, আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে ডিবির সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। ডিবি তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে।

গ্রেপ্তারের কিছুক্ষণ আগে সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে নিজের ফেসবুকে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় আখতারুজ্জামান বলেন, ডিবি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে দোয়া চান এবং জনগণ ও দেশের মানুষের জন্য, বিশেষ করে প্রবাসীদের জন্য জীবন উৎসর্গ করার কথা বলেন।

ভিডিওবার্তায় তিনি বলেন, “দোয়া করবেন, আমি যেন জনগণের জন্য, দেশের মানুষের জন্য, বিশেষ করে প্রবাসী মানুষের আত্মরক্ষার জন্য যদি শহীদ হতে পারি। আল্লাহ যেন আমার সেই দাবি কবুল করেন। জনগণের অধিকারের সংগ্রামে আমি আছি, থাকব। যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন জনগণের পাশে থাকব। জনগণের জন্য সংগ্রাম করব। জনগণের জন্য এই জীবন ত্যাগ করব।”

এর আগে শুক্রবার ভোররাতে বিমানবন্দর থানায় আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা করেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিরাপত্তা কর্মকর্তা শাহরিয়ার আলম সজিব। মামলায় সরকারি কাজে বাধা ও হুমকি প্রদানের অভিযোগ আনা হয়েছে।

বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান তালুকদার বলেন, সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তা কর্মকর্তা বাদী হয়ে মেজর আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগে মামলা করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।

মামলাটি আদালতে উপস্থাপনের পর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীর তা গ্রহণ করেন। বিমানবন্দর থানার এসআই মাজেদুল ইসলামকে আগামী ১০ নভেম্বরের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই আবু বক্কর ছিদ্দিক জানান।

জমজমের পানি নিয়ে শুরু উত্তেজনা
মামলার সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকালে মদিনা থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটে ওমরাহ যাত্রীরা শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছান। ফ্লাইটটি সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে বিমানবন্দরে আসে। ওই সময় আগমনী যাত্রীর চাপ বেশি থাকায় ট্রলি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, জামায়াতের ৩৪ জন প্রতিনিধি সপরিবারে ওই ফ্লাইটে ছিলেন। কয়েকজন প্রটোকল সহকারী লাইনের নিয়ম ভেঙে ট্রলি নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে লাগেজ পেতে দেরি এবং জমজমের পানি সরবরাহে বিলম্ব হওয়াকে কেন্দ্র করে কয়েকজন উত্তেজিত হয়ে পড়েন।

এর মধ্যে বেলা পৌনে ১১টার দিকে ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে ঘটনাস্থলে ডেকে পাঠান। নির্বাহী পরিচালক সেখানে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন।

এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, এ সময় আখতারুজ্জামান আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে নির্বাহী পরিচালকের দিকে এগিয়ে যান এবং তাকে রূঢ় ও অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করেন। তিনি নির্বাহী পরিচালককে উদ্দেশ করে বলেন, “আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা”, “গেইট আউট ফ্রম হিয়ার”, “ঘাড় ধরে বের করে দিব”, “কাজ জানেন না, তদবির করে পোস্টিং এ আসবেন”, “মাইর খাইতে চান?”

পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ঢাকা-৫ আসনের এমপি কামাল হোসেন নির্বাহী পরিচালককে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর আখতারুজ্জামান উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে বিমানবন্দরে বেঁধে মারধর এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রকাশ করার হুমকি দেন বলেও মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। একই সময় তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত সম্পর্কে অশালীন ও অবমাননাকর মন্তব্য করেন বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।

নিরাপত্তা সুপারভাইজারকে মারধরের অভিযোগ

মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, আখতারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা কয়েকজন প্রটোকল সহকারী বিমানবন্দরের সংরক্ষিত কেপিআই এলাকায় মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন তাদের ভিডিও ধারণে নিষেধ করেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, এতে আখতারুজ্জামান ক্ষিপ্ত হয়ে কামাল উদ্দিনকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং একপর্যায়ে শারীরিকভাবে আঘাত করেন। এজাহারে বলা হয়েছে, মারধরের ঘটনাটি সিসিটিভির আওতাভুক্ত ছিল না। তবে ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মাধ্যমে বিষয়টি প্রমাণ করা সম্ভব বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

পরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে গেলে তার সঙ্গেও আখতারুজ্জামান অশোভন ও মারমুখী আচরণ করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একই সময় সাধারণ যাত্রীদের জমজমের পানির বোতল ট্রলি থেকে ছুড়ে ফেলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে সংরক্ষিত বিমানবন্দর এলাকায় সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি বিমানবন্দরের স্বাভাবিক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

জমজমের পানি দিতে দেরি, দুই কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত

এদিকে ওমরাহ যাত্রীদের জমজমের পানি সরবরাহে দেরির ঘটনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তারা হলেন ব্যাগেজ ইনচার্জ মনিরুল ইসলাম প্রধান ও ফ্লাইট সুপারভাইজার সাদ্দাম হোসেন।

দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তাদের কাছে ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে।

আখতারুজ্জামানের রাজনৈতিক পরিচয়

মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জন কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে কটিয়াদী আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি টানা দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে আসনটির সঙ্গে পাকুন্দিয়া উপজেলা যুক্ত হয়।

দ্বিতীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি থেকে পাঁচবার বহিষ্কৃত হওয়ার পর তিনি ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। দলটির শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে প্রাথমিক সহযোগী সদস্য ফরম পূরণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনটিতে যোগ দেন তিনি।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পুলিশের সাবেক আইজি নূর মোহাম্মদের কাছে পরাজিত হন আখতারুজ্জামান। তিনি জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।

এবার ওই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তার ছোট ভাই আনিসুজ্জামান খোকন। তিনি ১৯৭৯ সালে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ময়মনসিংহ-১৯ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে