রাজশাহীর তানোরে এক চুল ব্যবসায়ীকে একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক যুবদলকর্মী ও পুলিশের বিরুদ্ধে। হাফিজুর রহমান (৪০) নামের ওই ব্যবসায়ীর অভিযোগ, যুবদলকর্মী ইমরান আলীর ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবির ব্যাপারে থানায় অভিযোগ করায় তাঁকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে তাকে দুটি মামলার আসামি করা হয়েছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে নতুন একটি মামলায়। পুলিশ বলছে, গত বৃহস্পতিবার রাত ৮টা ১০ মিনিটে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ব্যানারে হওয়া একটি মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন হাফিজুর রহমান। অথচ কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় তিনি আগের মামলায় রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারেই বন্দী ছিলেন। সেদিন রাজনৈতিক মামলার আসামি হাফিজুরসহ ছয়জনকে রাত ৯টার পর মুক্তি দেওয়া হয়। তাহলে মুক্তির দেড় ঘণ্টারও কম সময় আগে তিনি কীভাবে কারাগার থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের তানোরে মিছিলে অংশ নিলেন-এ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
ভুক্তভোগী হাফিজুর রহমানের বাড়ি তানোর উপজেলার কলমা ইউনিয়নের চন্দনকৌঠা গ্রামে। চন্দনকৌঠা বটতলা মোড়ে তাঁর একটি দোকান রয়েছে। সেখানে ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে নারীদের ঝরে পড়া চুল কেনেন তিনি। তাঁর বাবা নুরুল ইসলাম একসময় উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন। প্রায় দুই মাস আগে তিনি মারা গেছেন। তবে হাফিজুর নিজে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।
হাফিজুরের অভিযোগ, সম্প্রতি স্থানীয় যুবদলকর্মী ইমরান আলী তাঁর কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা না দিলে দোকান দখল করে নেওয়ার হুমকিও দেন। গত ৪ সেপ্টেম্বর ইমরান কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে তাঁর দোকানে গিয়ে মারধর করেন। এ ঘটনায় তিনি তানোর থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। তাঁর ভাষ্য, অভিযোগটি তদন্ত করতে গিয়ে একজন উপপরিদর্শক ঘটনার সত্যতা পেয়েছিলেন। কিন্তু এরপরও ইমরানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এরপর গত ২৩ সেপ্টেম্বর ভোররাতে তানোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসান একদল পুলিশ নিয়ে হাফিজুরের বাড়িতে যান। হাফিজুরের অভিযোগ, ওসি বাড়ির কাঠের দরজায় লাথি দিয়ে ভেঙে ভেতরে ঢোকেন এবং তাঁকে ধরে থানায় নিয়ে যান। পরে ২৬ জুন দায়ের হওয়া একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২৩ জুন কামারগাঁ ইউনিয়ন বিএনপি কার্যালয়ে হামলার অভিযোগে এই মামলা করেছিলেন মাহফিজুর রহমান নামের এক যুবদল নেতা। হাফিজুর ওই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন না; তদন্তে পাওয়া আসামি হিসেবে তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
ওই মামলায় ২১ দিন কারাভোগের পর আদালত থেকে জামিন পান হাফিজুর। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে তিনি কারাগারের মুক্তি শাখায় অপেক্ষা করছিলেন বলে তিনি জানান। তাঁর দাবি, রাত ৯টা ৪৭ মিনিটে কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় ফটকের ঘড়িতে সময় দেখেন। কিন্তু এর আগেই সেদিন রাত ৮টা ১০ মিনিটে তানোরের পাগল দেওয়ান পাকা রাস্তার খাড়ির ধারে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ব্যানারে মিছিল করার অভিযোগে তাঁকে নতুন মামলার আসামি করা হয়। শুক্রবার বিকেলে পুলিশ বাদী হয়ে ওই মামলাটি দায়ের করে।
তানোর থানার উপপরিদর্শক জাহাঙ্গীর আলমের দায়ের করা মামলায় ২২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি করা হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে। এতে হাফিজুরকে ৯ নম্বর আসামি করা হয়েছে।
অথচ রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার ফৌজিয়া আক্তার ববি জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার জামিনে প্রায় শতাধিক আসামি মুক্তি পেয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক মামলার আসামি ছিলেন হাফিজুরসহ ছয়জন। যাচাই-বাছাই শেষে তাঁদের সবার পরে মুক্তি দেওয়া হয়। রাত ৯টার পর তাঁরা কারাগার থেকে বের হন বলেও নিশ্চিত করেন তিনি।
ভুক্তভোগী হাফিজুর রহমান বলেন, ‘যুবদলকর্মী ইমরান আলীকে চাঁদা না দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করায় আমাকে একের পর এক মিথ্যা মামলায় আসামি করা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ আমার করা অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে। কিন্তু যুবদলকর্মী বলে ইমরানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো ইমরানের কথায় ওসি আমাকে একের পর এক মিথ্যা মামলায় আসামি করছেন। এক মামলায় জামিন পেতেই আরেকটি মামলা দেওয়ায় এখন পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে।’
অভিযোগ অস্বীকার করে যুবদলকর্মী ইমরান আলী বলেন, হাফিজুরের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তিনি বলেন, ‘পুলিশ কেন আমার কথা শুনে তাঁকে একের পর এক মামলা দেবে? আসলে আমি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য পদে ভোট করব। এ জন্য আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো হচ্ছে। আমি কোনো চাঁদা চাইনি।’
তানোর থানার ওসি মাহমুদুল হাসান বলেন, যুবদলকর্মী ইমরানের কথায় হাফিজুরের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে-এ অভিযোগ সত্য নয়। চাঁদা দাবির বিষয়ে হাফিজুরের করা অভিযোগের তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ওসি বলেন, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা তদন্ত কর্মকর্তা বলতে পারবেন। তাঁর সঙ্গে কথা না বলে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারবেন না বলে এড়িয়ে গেছেন।
কারাগারে থাকা অবস্থায় হাফিজুরকে নতুন মামলায় আসামি করার বিষয়ে ওসি বলেন, ‘একটা মিসিং হতে পারে। টাইপ মিসটেক হতে পারে। পুলিশের কাছে রং ম্যাসেজও আসতে পারে। এভাবে কেউ ভুল করে আসামি হয়ে যেতে পারে। তদন্তে সম্পৃক্ততা পাওয়া না গেলে তাঁকে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হবে।’
গোদাগাড়ী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মীর্জা মো. আব্দুস ছালাম বলেন, মামলার ঘটনার সময় কেউ কারাগারে থাকলে ওই ঘটনার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা না থাকার বিষয়টি বোঝা যায়। এরপরও কেন তাঁকে আসামি করা হলো, তা খতিয়ে দেখা হবে। সম্পৃক্ততা না থাকলে অভিযোগপত্র থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।