দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে চায় সরকার। তবে ঐক্যের উদ্যোগের মধ্যেই একটি মহল বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে বিতর্কিত না করে কারও কোনো বক্তব্য বা দাবি থাকলে তা জাতীয় সংসদে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে ধর্ম, মত ও শ্রেণি-পেশার ভেদাভেদ ভুলে দেশের উন্নয়ন এবং মানুষের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে রংপুর নগরীর ধর্মসভা রাধা গোবিন্দ মন্দিরে শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমী উপলক্ষে আয়োজিত শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন তারেক রহমান। বেলা ১২টার পর মন্দির প্রাঙ্গণে পৌঁছালে হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তাঁকে বরণ করে নেওয়া হয়। একদল শিশু নৃত্য পরিবেশনার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানায়। পরে তিনি মন্দিরে উপস্থিত ভক্তদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন, পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার যখন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলতে এবং দেশের মানুষের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে চাইছে, তখন একটি মহল বিভিন্নভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। অতীতেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার চেষ্টা হয়েছিল, যা দেশের মানুষ ভালোভাবে নেয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে তারেক রহমান বলেন, ওই আন্দোলনকেও কোনো কোনো মহল বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। গণতন্ত্রকামী মানুষের পক্ষ থেকে তিনি সবাইকে এ ধরনের চেষ্টা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারও কোনো বক্তব্য বা দাবি থাকলে তা জাতীয় সংসদে তুলে ধরা উচিত। জনগণ তাঁদের প্রতিনিধিদের সংসদে পাঠিয়েছেন। সেখানে আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে জনগণ এবং রাষ্ট্রের জন্য যা ভালো, তা গ্রহণ করা সম্ভব। সংসদের বাইরে এমন কোনো কর্মকাণ্ড করা উচিত নয়, যাতে স্কুল-কলেজের কার্যক্রম, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে দেশ স্বাধীন করার জন্য লড়াই করেছিলেন বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। বিভিন্ন ধর্ম, মত ও শ্রেণি-পেশার মানুষ সেই সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে রাজপথে নেমেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে যখনই মানুষের রাজনৈতিক অধিকার বাধাগ্রস্ত হয়েছে, তখনই বিভিন্ন ধর্ম, মত ও পেশার মানুষ অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানেও দল, মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ছিল।
বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে বসবাস করছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতেও যেন সবাই শান্তিতে থাকতে পারেন, সেই পরিবেশ বজায় রাখা প্রয়োজন। ধর্মীয় পরিচয় বা মতের ভিন্নতার কারণে কাউকে আলাদা না করে দেশের নাগরিক হিসেবে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
নির্বাচনে বিএনপি বা দলটির প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন কি না, সেই পার্থক্য না করে সবার জন্য কাজ করার অঙ্গীকার করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, সরকার শুধু যারা ভোট দিয়েছেন তাঁদের নয়, যারা ভোট দেননি তাঁদেরও সরকার হতে চায়।
দেশের অর্থনৈতিক সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়ে সব অঞ্চলে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে দেশের সব এলাকার উন্নয়ন করতে চায় সরকার। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও যেন রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের সুফল পান, সে লক্ষ্যেই কাজ করা হবে।
তারেক রহমান জানান, রংপুর মহানগরের উন্নয়নে গত দুই সপ্তাহে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া রংপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামের মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। স্থানীয় সরকারব্যবস্থার মাধ্যমে এসব কাজ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে স্কুল-কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন, সেতু, কালভার্ট ও সড়ক নির্মাণের মতো কাজ রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে এসব উন্নয়নকাজ করা হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে হলে রাজনৈতিক ও সামাজিক ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের প্রয়োজন পূরণ এবং উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
রাধা গোবিন্দ মন্দিরের অনুষ্ঠানে মন্দিরের সভাপতি ভবতোষ সরকার ও সাধারণ সম্পাদক খোকন সরকার প্রধানমন্ত্রীকে একটি ক্রেস্ট উপহার দেন। এ সময় মন্দির কর্তৃপক্ষের হাতে ১০ লাখ টাকার অনুদানের চেক তুলে দেন তারেক রহমান।
মন্দিরের পেছনে থাকা হোস্টেলের অবকাঠামো উন্নয়নে আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টি দেখার জন্য স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। মন্দিরের উন্নয়নে স্থানীয় সরকারকে আরও উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্তু কুমার কুণ্ড, সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল ও নিপুণ রায় চৌধুরী, ছাত্রদল নেতা পার্থ দেব এবং গণেশ চন্দ্র রায় সাহস বক্তব্য দেন। রংপুর ধর্মসভার স্বপন কুমার ভট্টাচার্যও অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, নারী ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান সামু, মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মাহফুজ উন নবী ডন, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম এবং ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব পরিতোষ চক্রবর্তীসহ রংপুরের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির নেতারা।
রাধা গোবিন্দ মন্দিরের অনুষ্ঠানের পাশাপাশি রংপুরের পাগলাপীরেও একটি পথসভায় বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে দেশ গড়ার আহ্বান জানান।
পথসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশের মানুষ বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে সরকারি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হয়েছে এবং কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের জন্য মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্মীয় পরিচয় বা ভিন্নতার কারণে কাউকে আলাদা না করে দেশের নাগরিক হিসেবে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। দেশের উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা সরকারের অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছে আনুষ্ঠানিকতা শেষে সড়কপথে রংপুরের উদ্দেশে রওনা হন। পথে তারাগঞ্জ ও পাগলাপীর এলাকায় সংক্ষিপ্ত পথসভায় বক্তব্য দেন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। মহাসড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ তাঁকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান।
পাগলাপীরের পথসভা শেষে প্রধানমন্ত্রী রংপুর নগরীর ধর্মসভা রাধা গোবিন্দ মন্দিরে যান। রংপুরের কর্মসূচি শেষে তাঁর রাজশাহী ও চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে। রাজশাহীতে একটি পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও জনসভায় অংশ নেওয়ার পর বিমানযোগে চট্টগ্রামে যাওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। সেখানে নগরীর জে এম সেন হল-রহমতগঞ্জ পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে রাতে ঢাকায় ফেরার কর্মসূচি রয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই তারেক রহমানের প্রথম রংপুর সফর।