তাপদাহে ঝড়ছে আম, গাছে ফাটছে লিচু, উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা

এম এম মামুন; রাজশাহী | প্রকাশ: ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:০৪ এএম
তাপদাহে ঝড়ছে আম, গাছে ফাটছে লিচু, উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা
খরায় পুড়ছে বরেন্দ্র রাজশাহী অঞ্চল। আমের শহরে দিনের তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়ছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রায় বোঁটার রস শুকিয়ে ঝরে পড়ছে আমের গুটি। গাছে গাছেই ফেটে নষ্ট হচ্ছে কাঁচা ও আধা পাকা লিচু। এতে বাজারে তোলার আগেই ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছেন আম ও লিচু চাষিরা। পানির সেচ ও নানা পদ্ধতি অবলম্বন করেও ঠেকানো সম্ভব না হওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। এবার আম ও লিচুর উৎপাদনে বিপর্যয়ের আশঙ্কাও করছেন তারা।সরেজমিনে রাজশাহী মহানগরী ও উপজেলাগুলোর আম ও বাগান ঘুরে দেখা গেছে, অনেক বাগানে আমের গুটি শুকিয়ে কালচে হয়ে ঝরে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও গুটিতে দাগ পড়ে পচন ধরছে। আর গাছে গাছেই ফেটে নষ্ট হচ্ছে কাঁচা ও আধা পাকা লিচু। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়া, অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে আম বাগান রয়েছে। যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের। গেল বছর ছিল ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৬০ হাজার টন। এক বছরে কমেছে ৫৪১ হেক্টর আম বাগান। অপরদিকে গত বছর ৫২৮ হেক্টর বাগানে লিচু চাষ হয়েছিল। এর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৭৬৮ টন। এক বছরের ব্যব ধানে দুই হেক্টর কমেছে লিচু চাষ। তবে লিচু চাষের জমি কমলেও উৎপাদন বাড়ার আভাস দিয়ে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৭৭৫ টন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। রাজশাহী নগরীর বুধপাড়া এলাকার আম চাষি আবু হেনা জানান, গাছে ভালো মুকুল এসেছিল। গুটিও ধরেছিল, কিন্তু বৃষ্টি না থাকায় গুটি টিকছে না। প্রতিদিনই ঝরে পড়ছে। এতে সম্ভাব্য ফলন অনেকটাই কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অপর আম চাষি শামিম বলেন, বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আমের গুটি ঝরে যাচ্ছে। গাছের গোড়ার মাটি খুরে পানি দিয়ে ছিলাম। আম ঝরে পড়া কমেছে। তবে পুরো বাগানে সেচ দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন কৃষি অফিস। সেচ দিতে পারা যাচ্ছে না ডিজেলের (জ্বালানি) অভাবে। গড়ে প্রতি কেজিতে ৪০টি লিচু ধরে হিসাব অনুযায়ী ১০০টি লিচুর ওজন আড়াই কেজি হয়। আর ১০০ লিচুর গড় মূল্য ধরা হয়েছে ৪০০ টাকা। সেই হিসাবে চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে অর্ধকোটি টাকার লিচুর ব্যবসা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে; যা আগের তুলনায় কম। রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের তথ্যে জানা গেছে, গত কয়েক দিনে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মধ্যে বড় ধরনের ওঠানামা হয়েছে। দেশের ১৩টি জেলার ওপর দিয়ে তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে রাজশাহীতে ৩৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আম ও লিচুর মুকুল আসার পর থেকে পুরো সময়ে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় মাটির আর্দ্রতার ঘাটতি আরও প্রকট হয়েছে। কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন আবহাওয়ায় আম ও লিচুর খোসা দ্রুত ফুলে ওঠে আবার সংকুচিত হয়। এই চাপ সহ্য করতে না পেরে আমের গুটি ঝড়ে যায়, আর লিচু ফল ফেটে যায়। বিশেষ করে গরমের পর হঠাৎ আর্দ্রতা বৃদ্ধি পেলে এই সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করে।রাজশাহীর পবা উপজেলার লিচু চাষি আব্দুল মালেক বলেন, আমরা প্রতিবছরই কিছু না কিছু সমস্যার মুখোমুখি হই, কিন্তু এ বছরের মতো এমন পরিস্থিতি আগে দেখিনি। কয়েক দিন আগেও প্রচণ্ড গরমে গাছের মাটি শুকিয়ে গিয়েছিল। এখন আবার হঠাৎ আর্দ্রতা বেড়েছে। এতে লিচুর খোসা ফেটে যাচ্ছে। অনেক গাছে অর্ধেকের বেশি লিচুই নষ্ট হয়ে গেছে। যদি দ্রুত আবহাওয়া স্বাভাবিক না হয়, তাহলে আমাদের বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে। গোদাগাড়ী উপজেলার আরেক চাষি শফিকুল ইসলাম বলেন, লিচু চাষে অনেক খরচ। সার, কীটনাশক, শ্রমিক- সব মিলিয়ে বিনিয়োগ কম না। কিন্তু এখন যেভাবে লিচু ফেটে যাচ্ছে, তাতে লাভ তো দূরের কথা, খরচ উঠবে কি না তা নিয়েও সন্দেহ। বৃষ্টি না থাকায় আমরা সেচ দিচ্ছি, কিন্তু হঠাৎ আর্দ্রতা বাড়ায় গাছের অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এই আবহাওয়া চলতে থাকলে পুরো মৌসুমটাই ঝুঁকিতে পড়বে। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গুটি অবস্থায় আম ও লিচু গাছের জন্য মাটি আর্দ্র থাকা জরুরি। কিন্তু দীর্ঘ খরায় মাটির আর্দ্রতা কমে গেলে গুটি ঝরে পড়ে। পাশাপাশি পোকামাকড় ও রোগের আক্রমণও বাড়ছে। চাষিদের নিয়মিত সেচ দেওয়া, প্রয়োজন অনুযায়ী ছত্রাকনাশক ব্যবহার এবং গাছের পরিচর্যা বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, এখনো সেভাবে খরা পড়েনি। টুকটাক বৃষ্টি হচ্ছে, যদিও সামান্য। যে সকল গাছে গুটি ঝরা ও লিচু নষ্ট হতে দেখা দিয়েছে বা শুকিয়ে যাচ্ছে, তাদের আমরা গাছের গোড়ায় সেচ দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। তাহলে আমের গুটি ঝরা ও নিচু নষ্ট থেকে রোধ হবে। রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, আম ও লিচু একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ফল। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সামান্য পরিবর্তনেও এর ওপর প্রভাব পড়ে। এ বছর যে ধরনের আবহাওয়ার ওঠানামা দেখা যাচ্ছে, তা লিচুর জন্য অনুকূল নয়। আমরা কৃষকদের নিয়মিত হালকা সেচ দিতে বলছি, যাতে মাটির আর্দ্রতা স্থিতিশীল থাকে। একই সঙ্গে গাছের গোড়ায় মালচিং করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা যায়। তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, দীর্ঘ সময় শুকনো থাকার পর হঠাৎ অতিরিক্ত পানি পেলে ফল ফেটে যায়। তাই সেচ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য রাখা জরুরি। কৃষকদের আমরা মাঠপর্যায়ে পরামর্শ দিচ্ছি। এখনো সময় আছে, সঠিক পরিচর্যা করলে ক্ষতি কিছুটা কমানো সম্ভব। তবে আবহাওয়া যদি আরও অস্থির হয়, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।