টানা প্রায় দুই বছর কর্মস্থলে অনুপস্থিত। হাজিরা খাতায় নাম নেই, নেই শিক্ষার্থীদের সাথে কোনো যোগাযোগ। তবুও নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা পকেটে ভরছেন লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক শরওয়ার আলম। তিনি জেলার আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী হত্যা মামলার এই আসামি ও দাপুটে নেতার এমন ভুতুড়ে বেতন উত্তোলনের ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শরওয়ার আলমের নিয়োগ প্রক্রিয়াটিই ছিল অনিয়মে ঘেরা। ১৯৯৭ সালে তিনটি তৃতীয় বিভাগ থাকা সত্ত্বেও জালিয়াতির মাধ্যমে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের প্রভাষক পদে নিয়োগ পান তিনি। পরবর্তীতে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বিধি বহির্ভূতভাবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন। নিয়ম অনুযায়ী ১২ বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হলেও মাত্র ১০ বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে এবং পূর্ববর্তী পদ থেকে ইস্তফা না দিয়েই ২০১২ সালে তিনি অধ্যক্ষ পদটি বাগিয়ে নেন। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান শুরু হলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র হত্যার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় তিনি অন্যতম আসামি। গত বছরের জুলাই থেকে আজ অবধি তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একদিনের জন্যও উপস্থিত হননি। অথচ রহস্যজনকভাবে তার নামে প্রতি মাসে বেতন বরাদ্দ হচ্ছে।
তদন্তে সত্যতা ও সাময়িক বরখাস্তের নাটক
২০২৪ সালের আগস্টে স্থানীয় ও শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে তার নিয়োগ সংক্রান্ত জালিয়াতির সত্যতা পাওয়া যায়। তৎকালীন ইউএনও নুর ই আলম সিদ্দিকী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। তবে অভিযোগ উঠেছে, তিন মাস পর সেই আদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ার সুযোগ নিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মোটা অঙ্কের উৎকোচ দিয়ে তিনি আবারও বেতন তোলা শুরু করেছেন। অধ্যক্ষ পলাতক থাকায় বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী অধ্যাপক আবুল হোসেন। তবে তার বিরুদ্ধেও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। ৪ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি আবু হেনা মোস্তফা জামানকে (সহকারী অধ্যাপক) ৭ বছর অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও বেতন প্রদান, প্রতিষ্ঠানের ইট-খোয়া পাচার এবং ফ্যান চুরির মামলা আপোসের নামে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানের সহকারী অধ্যাপক এটিএম আতাউর রহমান বলেন, আওয়ামী ক্ষমতার দাপটে জালিয়াতি করে তিনি পদে বসেছিলেন। এখন দুই বছর নেই, অথচ বেতন পাচ্ছেন। তাকে দেখে অন্য শিক্ষকরাও অনিয়মিত হয়ে পড়েছেন। আমরা শুনেছি তিনি আবারও যোগদানের পায়তারা করছেন। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবুল হোসেন নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ইউএনও স্যারের নির্দেশেই অনুপস্থিত অধ্যক্ষকে বেতন দিতে হচ্ছে। সরকার তাকে বেতন দিলে আমার করার কিছু নেই। আমারও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের ইচ্ছা নেই। এ বিষয়ে অভিযুক্ত অধ্যক্ষ লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক শরওয়ার আলমের মুঠো ফোনে একাধিক বার কল দিলেও তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিধান কান্তি হালদার বলেন, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বেতন শিট প্রস্তুত করে দেন, আমি শুধু অনুমোদন করি। এখানে লেনদেনের সুযোগ নেই। তবে পলাতক অধ্যক্ষ পুনরায় যোগদানের জন্য একটি লিখিত আবেদন করেছেন, যা আমরা খতিয়ে দেখছি। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দাবি, অবিলম্বে এই বিতর্কিত অধ্যক্ষের বেতন বন্ধসহ নিয়োগ জালিয়াতির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হোক।