সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন বর্গাচাষিরা। ফসল হারানোর পাশাপাশি ঋণের বোঝা এবং জমির মালিককে চুক্তি অনুযায়ী ধান পরিশোধের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
জানা গেছে, সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরের অধিকাংশ জমির মালিক শহরে বসবাসকারী ল্যান্ডলর্ডরা। তারা বহু আগেই সরাসরি ধান চাষ থেকে সরে গেছেন। ফলে হাওরাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা এখন পুরোপুরি নির্ভরশীল বর্গাচাষিদের ওপর।
এই বর্গাচাষিরাই ল্যান্ডলর্ডদের কাছ থেকে জমি নিয়ে চাষাবাদ করেন। জমি নেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি প্রচলিত রয়েছে। কেউ ভাদ্র মাসে অগ্রিম অর্থ প্রদান করে জমি নেন, আবার কেউ প্রতি কেধার (৩০ শতাংশ) জমির বিপরীতে ৪ থেকে ৫ মণ ধান দেওয়ার শর্তে চুক্তিবদ্ধ হন।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে বর্গাচাষিকে ধান দিতে হয় না। তবে কোনোভাবে ধান কাটা হলে, উৎপাদন যাই হোক না কেন, নির্ধারিত পরিমাণ ধান জমির মালিককে দিতে বাধ্য থাকেন চাষিরা।
এই ব্যবস্থার কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন বর্গাচাষিরাই, কারণ জমি তাদের নয়, অথচ বিনিয়োগ ও পরিশ্রমের পুরো দায়ভার বহন করতে হয় তাদেরকেই।
সদর উপজেলার ঝাওয়ার হাওর পাড়ের ইসলামপুর গ্রামের বর্গাচাষি আব্দুল হাফিজ জানান, তিনি ১২ কেয়ার জমি বর্গা নিয়েছিলেন। হঠাৎ বৃষ্টির পানিতে সব জমি তলিয়ে যায়। এর মধ্যে ৫ কেয়ার জমির কাঁচা ধান শ্রমিক দিয়ে পানির মধ্যেই কাটতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, “গরু বাঁচানোর জন্য ধান কাটছিলাম। এখন জমির মালিক বলছেন, ধান কেটেছি-তাই চুক্তির ধান দিতে হবে। আমি এখন কীভাবে বাঁচবো বুঝতে পারছি না।”
হাওরাঞ্চলের হাজার হাজার বর্গাচাষির অবস্থা প্রায় একই। তারা মহাজন বা এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেন। জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, কীটনাশকসহ সব খরচ বহন করেন নিজেরাই। ভালো ফলনের আশায় তারা বৈশাখে ঋণ পরিশোধের স্বপ্ন দেখেন, কিন্তু এবারের পরিস্থিতি সেই স্বপ্নকে অনিশ্চয়তায় ফেলেছে।
এবার হাওরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে এক ভিন্নধর্মী দুর্যোগ, যা এর আগে খুব একটা দেখা যায়নি। কোনো বাঁধ ভাঙেনি, তবুও টানা বৃষ্টির পানিতে বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা তলিয়ে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এ পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে মৎস্যজীবী সমিতির অব্যবস্থাপনা এবং অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ। হাওরের বড় বড় বিলগুলো দীর্ঘদিন ধরে মৎস্যজীবী সমিতির নামে লিজ দেওয়া হলেও, লিজের শর্ত অনুযায়ী নিয়মিত খনন বা বিলে বৃক্ষরোপণের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়নি।
কৃষকদের মতে, বিলগুলো যথাযথভাবে খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি সহজেই ধারণ করা সম্ভব হতো এবং হাওর ডুবে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না। ফলে অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার অভাবই এবারের এই অস্বাভাবিক দুর্যোগকে আরও তীব্র করে তুলেছে বলে মনে করছেন তারা।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, বৃষ্টির পানিতে হাওর প্লাবিত হওয়ার পেছনে অপরিকল্পিত বাঁধই প্রধানত দায়ী। তিনি উথারিয়ার বাঁধকে এর একটি বড় উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বৃষ্টির পানি হাওরে জমতে শুরু করলে স্থানীয় কৃষকরা শুরুতেই কুষকরো বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নেন। কিন্তু প্রশাসন ওই এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করায় তারা তা করতে পারেননি। ফলে পানি দ্রুত বের হতে না পেরে হাওরে জমে গিয়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
বিজন সেন রায় মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও সময়মতো পানি নিষ্কাশনের সুযোগ থাকলে এবারের এই দুর্যোগ অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হতো।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ওমর ফারুক জানান, জেলার ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১৪ লাখ মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। ইতোমধ্যে ২০৪৭ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, “ধান ভেজা থাকায় অনেক নষ্ট হচ্ছে। মিল মালিকদের সঙ্গে কথা হয়েছে-ড্রায়ার মেশিনে ধান শুকানোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এমদাদুল হক জানান, হাওরে আরও বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকলেও পানি কিছুটা কমেছে।