জ্যৈষ্ঠের আগেই রাজশাহীর বাজারে এসেছে রসালো ফল লিচু, দাম চড়া

এম এম মামুন; রাজশাহী
| আপডেট: ৩ মে, ২০২৬, ১২:১৫ পিএম | প্রকাশ: ৩ মে, ২০২৬, ১২:১৫ পিএম
জ্যৈষ্ঠের আগেই রাজশাহীর বাজারে এসেছে রসালো ফল লিচু, দাম চড়া
রাজশাহীর বাজারে উঠতে শুরু করেছে মৌসুমের রসালো ফল লিচু। বাংলাদেশের ঋতু পরিক্রমায় মধুমাস জ্যৈষ্ঠ আসতে এখনো ১০ দিন বাকি। কিন্তু জ্যৈষ্ঠের আগেই রাজশাহীর বাজারে উঠেছে অতিথি ফল লিচু। রাজশাহীর সাহেব বাজারে দেশি আগাম জাতের লিচু বিক্রি করতে দেখা যায়। বাড়তি লাভের আশায় আগেই বাজারে নিয়ে আসা হয়েছে এই লিচু। মৌসুমী ফল লিচু মিষ্টি ও রসালো হলেও অগ্রিম বাজারে আসা লিচু টক-মিষ্টি স্বাদের। এরপরও দাম বেজায় চড়া। দেশি জাতের ছোট আকৃতির ১০০টি লিচুর দাম ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। এছাড়া শরীরে একটু কালো দাগ পড়া লিচু বিক্রি হচ্ছে ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা। বেশি দামের কারণে সাধ থাকলেও লিচু কিনতে পারছেন না অনেকেই। ভরা মৌসুমে রাজশাহী মহানগরীর সাহেব বাজার, বিন্দুরমোড়, লক্ষ্মীপুর, স্টেশন ও শালবাগান বাজার ছাড়াও শিরোইল বাস টার্মিনাল সংলগ্ন বিভিন্ন সড়কের দুই পাশে লিচুর পসরা সাজিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু শনিবার দেখা গেছে কেবল সাহেব বাজার জিরোপয়েন্টের কয়েকটি দোকানে সামান্য লিচু। এই লিচু বেশি দাম দিয়েই কিনছেন কেউ কেউ। মৌসুমের শুরুতে রাজশাহীর বাজারে লিচু দেখেই পরিবারের জন্য কিনতে চেয়েছিলেন নগরীর ভদ্রা এলাকার দিনমজুর আলমগীর হোসেন। কিন্তু দাম শুনে আর সাহস পাননি। দিনে ৬০০ টাকা মজুরি পান, সেখানে একশ লিচুর দাম ৫০০ টাকা হওয়ায় তার পক্ষে কেনা প্রায় অসম্ভব। তিনি বলেন, লিচু কিনলে সংসারের নিত্য প্রয়োজনীয় বাজার করা কঠিন হয়ে যাবে। তাই শেষ পর্যন্ত লিচু না কিনেই বাড়ি ফিরতে হয়েছে তাকে। রাজশাহীর বাজারে লিচুর দাম বেড়ে যাওয়ায় এমন চিত্র শুধু আলমগীর হোসেনের নয়, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের আরও অনেক মানুষের। চলতি মৌসুমের শুরুতেই রাজশাহীতে লিচুর দাম আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছে। অতিরিক্ত খরা, গরম ও কম ফলনের কারণে বাজারে সরবরাহ কম থাকায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য জনপ্রিয় এই মৌসুমি ফল কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। রাজশাহী নগরীর সাহেব বাজার এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, প্রতি পিস লিচু ৫ থেকে ৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সে হিসেবে প্রতি ১০০ লিচুর দাম দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, যা গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি। আকার ও মান ভেদে দামের কিছুটা তারতম্য থাকলেও সামগ্রিকভাবে দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, মৌসুমের শুরুর দিকে সাধারণত লিচুর দাম কিছুটা বেশি থাকে। তবে এ বছর আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবের কারণে এই উচ্চমূল্য আরও কিছুদিন স্থায়ী হতে পারে। সরবরাহ বাড়লে দাম কিছুটা কমার সম্ভাবনা থাকলেও তা অনেকটাই নির্ভর করছে আবহাওয়ার ওপর। এদিকে বিক্রেতারা জানান, দীর্ঘ সময় বৃষ্টির অভাব ও তীব্র তাপদাহের কারণে লিচুর উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। অনেক গাছে লিচু স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠেনি। পাশাপাশি খরার কারণে অনেক লিচু পরিপক্ব হওয়ার আগেই ফেটে গেছে, ফলে বাজারজাতযোগ্য ফলের পরিমাণ কমে গেছে। আলমগীর হোসেনের মতো একই কথা জানান নগরীর তেরখাদিয়া ডাবতলা এলাকার বাসিন্দা মিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, লিচু এখনো পুরোপুরি পাকা হয়নি, কিন্তু দাম অনেক বেশি। একশ লিচু কিনতে চেয়েছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৫০টি লিচু আড়াইশো টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে। সাহেব বাজারে লিচু বিক্রি করা হায়দার আলী নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, এ বছর খরার কারণে অনেক লিচু নষ্ট হয়ে গেছে বা ফেটে গেছে। ফলে পাইকারি বাজার থেকেই কম লিচু পাচ্ছি। আগে যেখানে দিনে প্রায় ৫ হাজার লিচু বিক্রি করতাম, এখন ২ হাজার লিচু বিক্রি করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। দাম বেশি হওয়ায় অনেক ক্রেতা শুধু দাম জিজ্ঞেস করেই চলে যাচ্ছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফল উৎপাদনে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। রাজশাহীর মতো লিচু উৎপাদন এলাকায় খরা ও অতিরিক্ত তাপমাত্রা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে উৎপাদন আরও কমে যেতে পারে, যা বাজারমূল্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন বলেন, লিচু এখনো পরিপক্ব হয়নি। লিচুর বাজারজাত করতে আরও ১৫-২০দিন সময় লাগতে পারে। মৌসুমের প্রথম লিচু হওয়ায় বাজারে কিছুটা বাড়তি দাম রাখছেন বিক্রেতারা। তবে লিচুর বাজারজাত করা হলে সেই দাম অনেকটাই কমে যাবে। তিনি আরও বলেন, এ বছর রাজশাহীতে খরা ও অতিরিক্ত তাপমাত্রা অব্যাহত থাকায় লিচু উৎপাদনে কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। প্রতি বছর রাজশাহীতে লিচু চাষ বাড়ছে। লাভ হওয়ায় কৃষকরা লিচু চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।