বাংলাদেশের বিমান চলাচল ব্যবস্থাপনায় এক দীর্ঘস্থায়ী সংকট ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে- দেশের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোতে উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় পশু-পাখির উপস্থিতি মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রামের শাহ আমানত এবং সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দরে বারবার বার্ড হিট ও বন্যপ্রাণীর অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে, যা যাত্রী নিরাপত্তা ও বিমান পরিচালনায় বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের অবহেলা, অকার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাব এই সংকটকে আরও গভীর করেছে।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্যমতে,গত চার বছরে বিভিন্ন বিমানবন্দরে পাখির আঘাতে (বার্ড হিট) ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের লন্ডনগামী অত্যাধুনিক ড্রিমলাইনারসহ দেশি-বিদেশি অন্তত সাতটি উড়োজাহাজ। এর মধ্যে শাহজালালে এক দিনেই পৃথক দুটি পাখির আঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে বিমানবন্দরে পাখির আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইউএস-বাংলা, কাতার এয়ারওয়েজ ও আমিরাত এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজ। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সূত্র জানায়, চলতি বছরেই পাখির আঘাতে তাদের দুটি ফ্লাইটের জরুরি অবতরণের ঘটনা ঘটেছে।
এতে হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও উড়োজাহাজের প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়েছে। জানা যায়, ২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর শাহজালাল বিমানবন্দরে শ্রীলঙ্কা থেকে আসা ফিস্ট এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট অবতরণের সময় চাকার নিচে শিয়াল পড়ে যাওয়ার ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০০ জনের বেশি যাত্রী নিয়ে আসা ফ্লাইটটি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত বে’তে গিয়ে নিরাপদে দাঁড়ালেও ঘটনাটি আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল- বিমানবন্দরের রানওয়ে কতটা অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। এ ধরনের ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন নয়, বরং ধারাবাহিকভাবে ঘটছে। এর আগে ২১ মে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট শাহজালাল থেকে উড্ডয়নের পরপরই বার্ড হিটের শিকার হয়। এতে ইঞ্জিনে আগুন ধরে যায় এবং ২৯১ জন যাত্রী নিয়ে ফ্লাইটটি দ্রুত শাহজালালে ফিরে আসে।
যাত্রীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ২৮ জুন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সিঙ্গাপুরগামী একটি ফ্লাইট (বোয়িং-৭৩৭-৮০০) ঢাকা থেকে উড্ডয়নের পরই একটি ইঞ্জিন পাখির আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাইলট ঝুঁকি না নিয়ে বিমানটি জরুরি অবতরণ করান। ফলে অল্পের জন্য রক্ষা পায় যাত্রী, কেবিন ক্রু ও ফ্লাইট। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত শাহজালালে ৩০টির বেশি বার্ড হিটের ঘটনা ঘটেছে। শীত মৌসুমে পাখির উৎপাত আরও বাড়ে, ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। রানওয়েতে পশু-পাখির অবাধ বিচরণ শুধু উড্ডয়ন বা অবতরণে ঝুঁকি নয়, বরং প্রাণহানির আশঙ্কাও তৈরি করে। অ্যাভিয়েশন সেক্টরের বড় আতঙ্ক পাখির আঘাত বা ‘বার্ড হিট’।
উড়োজাহাজ যখন আকাশে ওড়ে, তখন বিপরীত দিক থেকে পাখি আঘাত করে। এমনকি কখনো কখনো পাখি এয়ারক্রাফটের ডানায় থাকা ইঞ্জিনের ভেতরেও ঢুকে পড়ে। তাতে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে উড়োজাহাজের মারাত্মক ক্ষতির শঙ্কা থাকে। এমনকি ইঞ্জিনে আগুনও ধরে যেতে পারে। পাখি হিট করার কারণে এয়ারক্রাফট মেরামতে কমপক্ষে এক সপ্তাহ থেকে কখনো কখনো দীর্ঘ সময় লেগে যায়। বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইঞ্জিনে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে মুহূর্তে সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিন প্রস্তুতকারী কোম্পানিকে জানাতে হয়। ওই কোম্পানির বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা এসে সবকিছু চেক করে যে নির্দেশনা দেন, সেভাবে মেরামত করতে হয়। এতে একদিকে এয়ারক্রাফট অচল হয়ে শিডিউল বিপর্যয় ঘটে, অন্যদিকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্স।
এই সমস্যা শুধু দেশীয় নয়, বিদেশি উড়োজাহাজেও ঘটছে। ফলে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। বর্তমানে শাহজালালে পাঁচটি গ্যাস ক্যানন (উচ্চ শব্দে বন্যপ্রাণী তাড়ানোর যন্ত্র) স্থাপন করা আছে, কিন্তু বেশিরভাগই অকার্যকর। ফলে বার্ড হিটের ঘটনা বেড়েই চলেছে। দীর্ঘদিন ধরেই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রামের শাহ আমানত ও সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পাখি ও শিয়াল মারার মানসম্মত অস্ত্র নেই। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোয়ও একই অবস্থা বিরাজ করছে। অথচ যে কোনো বিমানবন্দরের রানওয়ে অবশ্যই শতভাগ শঙ্কামুক্ত থাকা জরুরি।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম বলেন, যেকোনো বিমানবন্দরের রানওয়ে অবশ্যই শতভাগ শঙ্কামুক্ত থাকতে হবে। আমাদের রানওয়ে মাঝেমধ্যেই এ ধরনের ঘটনা উদ্বেগ তৈরি করছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে ভাবতে হবে। তিনি আরও বলেন, রানওয়েতে পশুপাখির অবাধ বিচরণে অবশ্যই ফ্লাইট উড্ডয়ন কিংবা অবতরণে ঝুঁকি। এতে করে যাত্রীদের প্রাণহানির শঙ্কাও থাকে। বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট) এয়ার কমোডোর নূরে আলম সিদ্দিকি বলেন, আমরা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। পশু-পাখিমুক্ত করার বর্তমানে যে ব্যবস্থা রয়েছে তার চেয়েও আধুনিক করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিভিন্ন দেশে যে ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে তারই আদলে এটি করা হবে। শুরুতে শাহজালাল থেকে এ কার্যক্রম শুরু হবে। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরেও তা স্থাপন করা হবে।