বরিশালে সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি তরমুজ চাষী ও পাইকাররা

এফএনএস (বরিশাল প্রতিবেদক) : | প্রকাশ: ৫ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:৩৫ এএম
বরিশালে সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি তরমুজ চাষী ও পাইকাররা

বরিশাল নগরীর কীর্তনখোলা নদী সংলগ্ন বিআইডব্লিউটিএর ইজারাকৃত বালুরঘাট এলাকায় মৌসুমি ফল তরমুজ বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট চক্র। দুরদুরান্ত থেকে আসা তরমুজ চাষিদের কাছ থেকে ৩২টিরও বেশি বাণিজ্যিক আড়ৎ নির্মাণ করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা। অভিযোগ উঠেছে, ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে সেখানে অবৈধভাবে ৩২টিরও বেশি বাণিজ্যিক আড়ৎ নির্মাণ করে তরমুজ বেচাকেনার হাট বসানো হয়েছে। স্থানীয় এই প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধাপে কৃষক ও পাইকারদের কাছ থেকে দফায় দফায় চাঁদা ও বাড়তি অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রান্তিক কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। সরেজমিনে দেখা গেছে, বালুরঘাটের সরকারি জমিতে বাঁশ ও তাবু টানিয়ে অন্তত ৩২টি আড়ৎ ঘর গড়ে তোলা হয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি আড়ৎ বসানোর জন্য আড়ৎ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অবস্থান ভেদে ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম নেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রশাসন ও ঘাটের ইজারাদারের নাম ভাঙিয়ে প্রতিদিন প্রতিটি আড়ৎ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। সরকারি জায়গায় ব্যক্তিগত বাণিজ্য চালু করায় রাজস্ব পাচ্ছে না বিআইডব্লিউটিএ। বিভাগের উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রলারে করে তরমুজ নিয়ে আসা কৃষকরা এখানে নেমেই সিন্ডিকেটের মুখে পরছেন। ট্রলার ভেড়ানোর সাথে সাথেই পার্কিং বাবদ ১০০ টাকা দিতে হয় পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নামে। এছাড়াও ট্রলার প্রতি বাংলাদেশ কার্গো ট্রলার বাল্কহেড শ্রমিক ইউনিয়নের নামে দিতে হয় ৬০ টাকা। চাষিদের অভিযোগ, ঘাটে তরমুজ নিয়ে আসলে আড়ৎদারদের মাধ্যম ছাড়া সরাসরি পাইকারের কাছে তরমুজ বিক্রির কোন উপায় নেই। বাধ্য হয়ে আড়ৎদারের মাধ্যমে বিক্রি করলে প্রতি ১০০ টাকায় ৫ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত আড়ৎদারি দিতে হচ্ছে। এর বাইরেও শ্রমিক খরচ বাবদ প্রতি পিস তরমুজে ৩ টাকা করে গুণতে হয় কৃষককে। ঘাট ইজারা বাবদ প্রতি পিস তরমুজে ৮০ পয়সা করে দিতে হয়। আড়ৎদারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আড়ৎগুলোর মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটির বৈধ কাগজপত্র থাকলেও বেশির ভাগ আড়তের অনুমোদন নেই। মৌসুমি ফল বিক্রির জন্যই এ সব আড়ৎ মালিকরা গড়ে তুলেছেন অনুমোদনহীন আড়ৎ। আর অনৈতিক সুবিধা পেতে তাদের সহযোগীতা করছেন ইজারাদাররা। আর এসব বিষয়ে কোন হস্তক্ষেপ করছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। শুধু কৃষক নয়, হয়রানির শিকার হচ্ছেন পাইকাররাও। আড়ৎ থেকে তরমুজ কিনে ট্রাকে তোলার সময় বিভিন্ন ধাপে বকশিশ ও নেতাদের নামে চাঁঁদা আদায় করা হয়। এছারাও ঘাটে ট্রাক পার্কিং বাবদ চাঁদা ও দিনের বেলায় নগরীতে ট্রাক চলাচল ও পার্কিং বাবদ ট্রাফিক পুলিশের নামেও চাঁদা আদায় করা হচ্ছে পাইকার ও ট্রাক চালকদের কাছ থেকে। এমনকি ট্রাকে তরমুজ সাজানোর জন্য প্রয়োজনীয় হোগলা বাইরে থেকে কেনার কোন সুযোগ নেই। ঘাট এলাকায় অবস্থানরত একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট থেকে চড়া মূল্যে (প্রতি পিস ১২০ থেকে ১৪০ টাকা) হোগলা কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। এর বাইরে বালুরঘাটে প্রতি পিস তরমুজে খাজনা ও ট্রাক পার্কিংয়ের জন্য ঘাট ইজারাদারকে দিতে হয় বিশাল অঙ্কের টাকা। ট্রলার চালকদের অভিযোগ, বালুরঘাটে তরমুজবাহী ট্রলার পার্কিং বাবদ নৌ-পুলিশসহ প্রশাসন ম্যানেজ করার কথা বলে ট্রলার প্রতি নেয়া হয় ১০০ টাকা। এছাড়াও ঘাটের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও বাড়তি টাকা নিচ্ছে ইজারাদার। ভুক্তভোগী কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জানান, এই সিন্ডিকেটের কারণে তরমুজের উৎপাদন খরচ ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তারা ন্যায্য মুনাফা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সাধারণ ক্রেতারাও চড়া দামে তরমুজ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন এ বিষয়ে বালুরঘাট ইজারাদার খাজা মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, ট্রলার পার্কিং বাবদ যে ১০০ টাকা নেয়া হয় সেটা আমার জানা নেই। তবে এটা বিআইডব্লিউটিএ নেয় মনে হয়। এছাড়াও ট্রাক পার্কিং যে খরচটা নেয়া হয় ট্রাক ট্রান্সপোর্টের লোকজন নেয়। ঘাটে ট্রাক পার্কিংয়ে যারা সহযোগিতা করে ওরা হয়তো ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে নেয় ট্রাক প্রতি। অগ্রীম কোন টাকা নেইনি। তবে আমরা খাল খনন এবং বর্ষায় এই ঘাটটি খানাখন্দ হয়ে যায় সেই জায়গা বালু ও  ইট দিয়ে ভরাটের জন্য আড়ৎ প্রতি ১ হাজার করে টাকা নিয়েছি। বরিশাল নদীবন্দর কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, আমরা ইজারা শর্ত মেনেই ঘাটটি ইজারা দিয়েছি। তারা শর্ত ভঙ্গ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে