বাড়ছে দূর্যোগ ঝুঁকি

কুয়াকাটার ৭৫ শতাংশ ম্যানগ্রোভ-ননম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সাগরে বিলীন

এফএনএস (কুয়াকাটা, পটুয়াখালী) : | প্রকাশ: ৫ এপ্রিল, ২০২৬, ০২:৪৯ পিএম
কুয়াকাটার ৭৫ শতাংশ ম্যানগ্রোভ-ননম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সাগরে বিলীন

প্রকৃতির রোষাণলের সঙ্গে মানুষের বননিধনের তান্ডবে কলাপাড়া-কুয়াকাটা উপকূলের সবুজের সমারোহ নিশ্চিহ্নের শঙ্কায় পড়েছে। দূর্যোগকালীন জলোচ্ছ্বাসের ঝাপটা প্রতিরোধে সবুজ দেওয়ালখ্যাত ম্যানগ্রোভ-ননম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল নিধনের যেন তান্ডব চলছে। গত দুই যুগে অন্তত ৭৫ শতাংশ বনাঞ্চল সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। পাশাপাশি বনখোকো চক্রের আগ্রাসী তান্ডবে এখন এই জনপদ বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এসব নিয়ন্ত্রণে কোন কর্তৃপক্ষ নেই। কুয়াকাটা সৈকতের খাজুরা থেকে গঙ্গামতি কাউয়ার চর পর্যন্ত এখন শুধু চোখে পড়ে বনাঞ্চল নিধনযজ্ঞ। আর প্রকৃতির রোষাণল সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে সাগরে ভেসে যাচ্ছে অবশিষ্ট যা আছে। হাজারো গাছের গোড়া, উপড়ে পড়া গাছ ও কাটা গাছের অংশের দেখা মেলে। সাজানো গোছানো সবুজ প্রকৃতি যেন এখন লন্ডভন্ড হয়ে আছে। অরক্ষিত হয়ে পড়েছে গোটা উপকূল। সরকার উপকূল রক্ষায় বনাঞ্চল রক্ষা এবং নতুন সৃজনের পদক্ষেপ নিলেও সব যেন বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

সরেজমিনে খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গেছে, বনবিভাগ কুয়াকাটা ক্যাম্পের এক হাজার আটশ’ ১৮ একরের অন্তত আট শ’ একর সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। একইভাবে গঙ্গামতি ক্যাম্পের ১১২৮ একরের প্রায় তিনশ’ একর সাগর গিলে খেয়েছে। খাজুরা ক্যাম্পের ৩৪৬ একরের নেই অর্ধেকটা। ধুলাসার ক্যাম্পের ৪৬১ একরের নেই একশ’ একরও। ইকোপার্কসহ জাতীয় উদ্যানের নেই দুই তৃতীয়াংশ। এভাবে বেড়িবাঁধের বাইরে কুয়াকাটা সৈকতের দীর্ঘ ১৮ কিলোমিটার এলাকার দেড় সহস্রাধিক একর বনভূমিসহ সংরক্ষিত বনাঞ্চল গত ২৪ বছরে সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের তান্ডবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। গোটা সৈকতের অন্তত দুই কিলোমিটার প্রস্থ এলাকা সাগর গিলে খেয়েছে। দূর্যোগকালীন ঝড়জলোচ্ছ্বাসের ঝাপটা প্রাথমিকভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়ার সবুজ দেওয়াল এভাবে সাগরগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বিলীনের এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। এর সঙ্গে চলছে প্রত্যেকটি বনের গাছপালা নিধনের তান্ডব চলছে। যে যেভাবে পারছে বন নিধন চালাচ্ছে।

কুয়াকাটা সৈকতের কোলঘেঁষা সবুজের দীর্ঘ আস্তরণ এখন আর নেই। এখন সব ধূসর,বিবর্ণ হয়ে আছে। খাঁ খাঁ করছে। হাজার হাজার মরা গাছের গোড়া স্বাক্ষী হয়ে পড়ে আছে। বনাঞ্চল যেটুকু অবশিষ্ট আছে তাও ফি-বছর সাগরের উত্তাল ঢেউ ভাসিয়ে নিচ্ছে। বর্ষার ছয় মাস প্রত্যেক অমাবস্যা-পূর্ণিমার তিথিতে অস্বাভাবিক জোয়ারের তান্ডব উপড়ে ফেলে হাজারো গাছপালা। মৃত শত শত গাছগুলো কঙ্কালের মতো পড়ে থাকে। একসময় চুরি হয়ে যায়। এভাবে সৈকতের জিরো পয়েন্টের পূর্ব দিকের সৌন্দর্যমন্ডিত স্পট ফার্মস এন্ড ফার্মস এর দুইশ’ একর জুড়ে নারিকেল, কাজু বাদাম বাগান নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। শেষ চিহ্ন নেই শাল, তাল, কড়াই বাগানের। প্রকৃতির রোষাণলে সাগরের অব্যাহত ভাঙনে দৃষ্টিনন্দন সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটার দীর্ঘ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলসহ সবুজের সমারোহ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। এখন অবশিষ্ট যা আছে তাও হারিয়ে যাচ্ছে। এনিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড, বনবিভাগ কিংবা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির কার্যকর কোন পদক্ষেপ দীর্ঘদিনেও পরিলক্ষিত হয়নি। কুয়াকাটার দীর্ঘ সৈকতের সবুজ দেওয়াল ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, সৈকতের পরিধি, সৈকত ঘেষা বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা রক্ষায় সাগরের ভাঙনরোধে স্থায়ী কোন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হয়নি। শুধু প্রকল্প তৈরি করে প্রস্তাবনা আকারে পাঠানো পর্যন্ত শেষ। এরপর আর কোন অগ্রগতি নেই। এক কথায় চরম দুরাবস্থা এবং দূর্যোগ ঝুঁিকতে রয়েছে দেশের অন্যতম সৌন্দর্যমন্ডিত সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটার মানুষ ও তাঁদের সম্পদ। এখানকার প্রতিবেশ পরিবেশ জীববৈচিত্র চরম হুমকিতে রয়েছে। বিনিয়োগকারীসহ পর্যটকের দাবি জরুরিভাবে সমীক্ষা শেষে গোটা সৈকত সাগরের ভাঙন থেকে রক্ষা করা হোক। সবুজ বনাঞ্চল যেটুকু আছে তা রক্ষায় স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হোক। স্থানীয় জেলেরা জানান, ২০০০ সালেও সৈকতের খাজুরা থেকে কাউয়ারচর পর্যন্ত দীর্ঘ এলাকা ছইলা-কেওড়া, গেওয়া, কড়াইসহ বিভিন্ন ধরনের গাছপালায় পরিপূর্ণ বনাঞ্চল ছিল। এখন সব সাগরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বেড়িবাঁধ থেকে সাগরের পারে যেতে আধাঘন্টা সময় লাগত। এখন পাঁচ মিনিটও লাগে না। বনদস্যুরাও দেদারছে কাটছে বনের গাছ।

পরিবেশ কর্মী কে এম বাচ্চু জানান, কুয়াকাটা সৈকতের অধিকাংশ বনাঞ্চল সাগরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এখন যা আছে তা রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানালেন তিনি। কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স এসোসিয়েশন সাধারণ সম্পাদক মোতালেব শরীফ জানান, দূর্যোগকালীন জলোচ্ছ্বাসের ঝাপটা প্রাথমিকভাবে প্রতিরোধ করার সবুজ দেয়ালখ্যাত বনাঞ্চল রক্ষা করতে না পারলে গোটা কুয়াকাটার মানুষ ও তাদের সম্পদের দূর্যোগ ঝুঁকি বাড়বে। এসব প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে না পারলে এখানকার কোন উন্নয়ন টেকসই হবে না বলেও তিনি দাবি করেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পটুয়াখালী জেলা সমন্বয় কমিটির সদস্য মুহাম্মদ আল ইমরান বলেন, ‘ উপকূল রক্ষা করতে হলে বনকাটার সংঘবদ্ধ চোরচক্রকে রুখতে হবে। বনবিভাগ মহিপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা কেএম মনিরুজ্জামান জানান, কুয়াকাটার জাতীয় উদ্যানসহ দীর্ঘ সৈকত ঘেঁষা ম্যানগ্রোভ-ননম্যানগ্রোভ অধিকাংশ বনাঞ্চল সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। যা উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। এ ছাড়া উপকূলীয় বন নিধনের সঙ্গে জড়িতদেও শণাক্তে তার কাজ করছেন বলে জানান। মোট কথা কলাপাড়ার গোটা উপকূল এখন বনাঞ্চল নিধনের কারণে অরক্ষিত হয়ে পড়েছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে